সবরকম রোগে লেবুর উপকারিতা।

সবরকম রোগে লেবুর উপকারিতা। Benefits of lemon in all diseases.

বর্ষাকালে ডাক্তারখানা, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কোথাও ঠাই নেই। ঘরে ঘরে আমাশা, জ্বর, জন্ডিস, বদহজম,অম্বল, গ্যাস, টাইফয়েড, আন্ত্রিক, আরও কত অসুখ বিসুখের রাজত্ব এই সময়। সব রােগের কারণ একটাই – পেটের গণ্ডগােল। পেট ঠিক থাকলে সাধারণত এই রােগগুলি হয় না। পেট ভালাে রাখতে গেলে লিভার ঠিক রাখতে হয়। আর লিভার ভালাে থাকলে হার্ট, কিড়নি, ফুসফুস সক্রিয় ও সতেজ থাকে। একটি কী দুটি পাতিলেবু এসবের মুশকিল আসান করাতে পারে।

নােবেলজয়ী অধ্যাপক ফার্ম মুলার মন্তব্য করেছেন - লেবু রােগ প্রতিষেধক এবং আরােগ্যকারক। লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে, যা শরীরের পক্ষে একান্ত প্রয়ােজনীয়। ভিটামিন সি শরীরে উৎপন্ন হয় না বা শরীরে সঞ্চিত থাকে না। শাকসবজি, ফল্পমূলের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। লেবু জাতীয় ফলেই ভিটামিন সি বেশি থাকে। লেবুর মৃদু সাইটিক অ্যাসিড পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সঙ্গে মিশে ক্ষারধর্মী হয়। সােডিয়াম বাই-সাইট্রেট উৎপন্ন করে।

সবরকম রোগে লেবুর উপকারিতা।
সবরকম রোগে লেবুর উপকারিতা।

প্রাকৃতিক চিকিৎসকরা, খাদ্যবিজ্ঞানীরা খালিপেটে নুন চিনি বাদে লেবুজল খেতে বলেন। এতে পাকস্থলীর অম্লত্ব কমে যায় ও হজমের সহায়ক হয়। মিষ্টি, ঝাল, তৈলাক্ত জাতীয় খাদ্য পাকস্থলীতে অন্ন উৎপাদন করে বিপর্যয় ডেকে আনে। কিন্তু পাতিলেবু বা লেবুজাতীয় ফল অম্লত্ব কমিয়ে ক্ষারত্ব বাড়িয়ে দেয় যা সুহ শরীরের পক্ষে একান্ত আবশ্যক।

তবে পাতিলেবু কোনও খাদ্যবস্তুর সঙ্গে বা ভাতের পাতে বা কোনও কিছু খেয়ে উঠেই খেতে নেই। ভাত, রুটি ইত্যাদি কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের সঙ্গে লেবু খেলে পাকস্থলীতে অত্যধিক টক্সিন উৎপন্ন হয়।

আরও পড়ুন
1. উত্তম পানীয় মধু।মধুর উপকারিতা।
2. ক্যানসার থেকে দূরে থাকতে যেসব খাদ্য বর্জন করা উচিত।
3. শরীর সচল রাখতে শশার বিকল্প নেই।
4. বর্ষাকালে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা

আয়ুর্বেদশাস্ত্রে পাতিলেবুকে সর্বরােগহর বনৌষধি বলা হয়েছে। ধন্বন্তরী একে অমৃতফা বলেছেন। অন্য কোনও ফলে এত গুণ নেই। ডাঃ উইলসন লেবুকে অদ্বিতীয় ফল বলেছেন। রক্তে অম্লত্ব বাড়লেই নানা রােগের শিকার হতে হয়। পাতিলেবু অম্লত্ব কমিয়ে দেয়। বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য পেটের যাবতীয় রােগ দূর করে। খিদে বাড়ায়, জীবাণু ধ্বংস করে এবং ক্লান্তি দূর করে। বায়ু, পিত্ত ও ক বিকৃত হাতে দেয় না। শুধু তাই নয়, চুল ওঠা বন্ধ করে, মুখের দুর্গন্ধ দূর করে, ব্রণ নাশ করে, রক্তের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করে, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে। আজকাল লেবু দিয়ে হরেকরকমের প্রসাধনী বের হয়েছে।

ভিটামিন সি রােগ নিরােধক ও ব্লেগারােগ্য মূলক এবং শরীরের ক্যালসিয়ামকে ধাতস্থ করতে সাহায্য করে। পিত্ত পাথুরি, বৃক্ক পাথুরি, ডায়াবেটিস, বাত, চর্মরােগে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক আর নেই। স্থূল ব্যক্তি মেদ কমাতে পারে। ঘামাচি, কাটা, ছেড়া, চুলকানি, ব্যথায় বাহ্যিক ব্যবহার করা যায়। চুলের দীপ্তি বাড়ায়। টনসিল, গলগণ্ড, পাইওরিয়া, খুসকি ভাল হয়।

মনে রাখতে হবে, সূর্যাস্তের পর লেবু খাওয়া চলবে না। লেবু কেটে ফেলে রাখা নিবে না। সবুজ লেবুর চেয়ে হলুণ লেবু (পাকা) বেশি উপকারী।

কখন কীভাবে খেতে হবেঃ

শুধু লেবু খেলেই হবে না। কখন কীভাবে খেতে হবে তা জানা চাই। অন্যথায় হিতে বিপরীত হবে। ভাতের পাতে ডালের সঙ্গে মাছ মাংস খাওয়ার পরে লেবু খেতে ভালাে লাগলেও না খাওয়াই ভালাে। শক্ত খাদ্যকে লেবুর রস তরল করে দিলেও পরিণামে বিষাক্ত টক্সিন বা অন্ন উৎপন্ন করে। লেবু-চা খেলেও অন্ন বাড়বে এবং রক্তের হিমোগ্লোবিন ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই লেবু-চা পান অনুচিত। সকালে এক কাপ বা অর্ধগ্লাস জলের সঙ্গে একটি বা দুটি লেবুর রস খেতে হবে। প্রতিদিনই খেতে হবে।

রােগের আধিক্য থাকলে দিনে ২/৩ বার খেতে হবে। নুন চিনি গুড় ইত্যাদি কিছুই মেশানাে চলবে না। ঠাণ্ডা জলই প্রশ জ্বর হলে ঈষদুষ্ণ জলে পান করা যায়। লেবুজল খেয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আগে-পরে কিছু খাওয়া চলবে না। চীনা মাটির পাত্র, পাথরের পাত্র বা কাচের পাত্র ছাড়া অন্য কোনও ধাতু পাত্রে খাওয়া ক্ষতিকর। সকাল থেকে বেলা ৩-৪ টার মধ্যে খেতে হবে। সন্ধ্যার পর রাতে লেবু খাওয়া নিষেধ। লেবু কেটেই সঙ্গে সঙ্গে লেবুর রস জলে মেশাতে হবে। শ্বেতসার, শর্করা বা অন্য কোনও লবণ ও ভিটামিনের সঙ্গে লেবু খাওয়া চলবে না। স্যালাড, শাকসবজির সঙ্গে লেবু রস মেশানাে শরীরে অন্নের ভাগ বেড়ে যাবে। এবং নানা রােগ আক্রমণ করাবে। কোনও টক ফাই রান্না করে, গরম করে এবং নুন, চিনি, মিষ্টি মিশিয়ে খেতে নেই।

অধিকাংশ বাঙালি অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিক রােগে ভােগেন। লেবুর সম্যক ব্যবহারই রক্তে ক্ষারত্ব বৃদ্ধি করে মুক্তি দিতে পারে। অন্নফলের মধ্যে, পাতিলেবুর মতাে রােগ প্রতিরােধক ও রােগ নিরাময়কারী আর কিছু নেই। এককথায় ‘সর্বরােগহর সর্বোষধি।

সত্যনন্দ গুহ (লেখক প্রাকৃতিক চিকিৎসক)

Previous
Next Post »