ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের রাজ্যাভিষেক।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের রাজ্যাভিষেক।

কাশীর পণ্ডিত গাগাভট্ট একদিন শিবাজীর সঙ্গে দেখা করার জন্য রায়গড় এলেন। শিবাজীর সঙ্গে গাগাভটুর দীর্ঘদিনের পরিচয়। তিনি মারাঠাব্রাহ্মণ হলেও কাশীতেই বসবাস করতেন। আওরঙ্গজেবের দ্বারা কাশী-বিশ্বনাথের মন্দির ধবংস, হিন্দু মা-বােনেদের ওপর অত্যাচার গাগাভট্ট নিজের চোখে দেখেছেন। ঠিক সেই সময় রায়গড়ে পরাক্রমী, প্রজানুরঞ্জক, ন্যায় নীতিপরায়ণ শিবাজী মহারাজ ‘হিন্দবী স্বরাজ প্রতিষ্ঠা করেন। রায়গড়ের সুশাসন দেখে গাগাভট্ট জিজ্ঞাসাকরলেন, “হে রাজ, আপনি এতাে সম্পদের অধিকারী, শক্তিশালী কল্যাণ  রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু রাজ্যের সিংহাসন কোথায়? এই মহৎ সংস্কারের জন্য আপনার সিংহাসন, ছত্র, চামর ইত্যাদি সার্বভৌম চিহ্ন ধারণ করে রাজ্যাভিষেক করে নেওয়া দরকার।' ‘রাজ্যাভিষেক? মহারাজের রাজ্যাভিষেক?’ সভাসদরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “আমাদের রাজা ছত্রপতি, সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজাধিরাজ হবেন, কী আনন্দের কথা! স্বয়ং শিবাজী মহারাজ শান্তভাবে বসে রয়েছেন, তাঁর মনে কোনও আনন্দের ভাব ফুটে উঠল না। কয়েকদিন পর শিবাজী তার রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং তাদের সামনে। রাজ্যাভিষেক সম্পর্কে বললেন। সকলেই আনন্দে নিজ নিজ সম্মতি জানালেন। স্বভাবতই শিবাজী পণ্ডিত গাগাভট্টের প্রস্তাবমতাে রাজ্যাভিষেকের জন্য রাজি হলেন।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের রাজ্যাভিষেক।
ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের রাজ্যাভিষেক।

শিবাজীর রাজ্যাভিষেকের কথা সর্বত্র প্রচার হয়ে গেল। সকলেই খুব খুশি। মা জিজাবাঈয়ের আনন্দ আর ধরে না। গগভট্টের ক্লান্ত শরীরে নবচেতনার সঞ্চার হলাে। রায়গড় হলাে গড়ের রাজা। এর নাম ছিল ‘রায়রী’, শিবাজীনাম দিয়েছেন রায়গড়। দুর্গটি কোংকন উপকূলে অবস্থিত। সমুদ্রতট থেকে ৯৫০ গজ উঁচুতে। লম্বা দু ক্রোশ চওড়া তুলনামূলক ভাবে কম। দুর্গের প্রবেশদ্বার তিনটি। রাস্তা এত দুর্গম ও জটিল যে মরতে চায় এমন ব্যক্তিও তা দেখে মরার ভয়ে পালিয়ে যেত। রায়গড়, প্রতাপগড়, সিন্ধু দুর্গ-সহ আরও ২০টি দুর্গ শিবাজী শক্তিশালী দুর্গে পরিণত করেছিলেন।

রায়গড়ে রাজ্যাভিষেকের প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ হতে চলেছে। শিবাজীরাজের জন্মপত্রিকা দেখে শুভ মুহূর্ত ঠিক করেছেন পণ্ডিত গাগাভট্ট। জ্যৈষ্ঠ শুল্কা ত্রয়ােদশী, ইংরেজি ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন সকাল ৫টায়। রাজ্যাভিষেকের আর ১৫ দিন বাকি। শিবাজী প্রতাপগড়ে গেলেন ভবানী মায়ের মন্দিরে। নিজ মস্তাকে ছত্র ধারণ করার আগে। দেবী ভবানীকে সওয়া মন ওজনের সােনার ছাতা অর্পণ করলেন। দেবী ভবানী তাে তার সব কিছু। তার হৃদয়, তার মস্তক, নেত্র, হাত সব কিছুর মধ্যে মা ভবানীর অধিষ্ঠান।তিনিই তাকে সব সময় প্রেরণা ও যশ প্রদান করেছেন।

রাজসভায় উঁচু বেদীর উপর সিংহাসন রাখা হলাে। বত্রিশ মন সােনা ও নরত্ন দিয়ে সিংহাসনটি তৈরি করেছেন রামাজীদত্রে। তার মধ্যে অঙ্কিত ছিল বহু শুভচিহ্ন। সভাগৃহের মধ্যে ছয় হাজার লােক সহজে বসতে পারে। প্রবেশদ্বার এমন উঁচু ছিল যে হাতি খুব সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে। দরজার দু'পাশে খুব সুন্দর দুটি পদ্মফুল এবং বাঘের চিত্র খােদাই করা ছিল। এসব ছিল হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রতীক। রাজসভার দুদিকে নবহখানা। সিংহাসনে বসার আগে পর্যন্ত শিঙ্গা, কর্ণ, সানাই বাজত। সিংহাসনের কাছে বসে সাধারণ গলায় কেউ  কিছু বললে সারা সভাগৃহে তা ভালােভাবে শােনা যেত। রাজসভার পশ্চিমদিকে মহল, বিচারসভা, অষ্ট প্রধানের কার্যালয়। রাজমহলের উপর তিনটি মিনার খুবই সুন্দর রুকার্যখচিত। সুবর্ণ সিংহাসনে বসে শিবাজীর রাজ্যাভিষেক হবে। রাজ্যাভিষেক ক্ষণে রাজ্যজুড়ে মঙ্গল ধ্বনি বাজতে লাগলাে। সমারােহের জন্য রায়গড়ে নিমন্ত্রিত ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিক, কবি, শিল্পী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, আত্মীয় স্বজনদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। শিবাজী ছিলেন খালিস ক্ষত্রিয় বংশােদ্ভূত। সেই আচার বিধি অনুসারে পণ্ডিত গাগাভট্ট রাজ্যাভিষেকের সবকিছু প্রস্তুতি করেছেন। সােনার চৌকির উপর শিবাজীর পাশে যুবরাজ সম্ভাজী ও পরিবারের সকলে এসে বসলেন। অন্যদের হাতে কলস বেদমন্ত্র উচ্চারণ আরম্ভ হলাে। গঙ্গা, যমুনা, সিন্ধু প্রভৃতি সপ্ত নদীর জল মহারাজা, মহারানি ও যুাজের মাথার উপর বর্ষিত হতে লাগলাে। সর্বত্র মহারাজের জয়ধ্বনি উৎঘােষিত হলাে।

রাজ্যাভিষেকের এই শুভ মুহূর্তে শিবাজীর মনে হতে লাগল তান্তাজী মালুসরকে। মনে হতে লাগল প্রতাপরাও গুজর, মুরার বাজী, বাজী পাসলকর, বীর যােদ্ধার মুখ, হাজার হাজার যুবক যাঁরা এই হিন্দু সাম্রাজ্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, কত মায়ের  কোল খালি হয়েছে, তার বিনিময়ে আজ এই সিংহাসন। মহারাজের মস্তক নত হলাে।

মহারাজের মাথায় অভিষেক বারিধারা বর্ষিত হয়ে চলেছে। অভিষেকের পর মহারাজা মহারানি এবং যুবরাজ বস্ত্রালঙ্কার ধারণ করলেন। রাজ্যাভিষেকের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। মহারাজের বাম হাতে সােনার  বিষ্ণুমূর্তি, ডান হাতে ধনুষ, কোমরে মা ভবানীর তলােয়ার। সমস্ত দেবদেবীকে প্রণাম করে, কুলগুর চরণধূলি নিয়ে মাতা জিজাবাঈয়ের কাছে উপস্থিত হলেন। মহারাজ সহ সকলে মায়ের চরণে প্রণাম করলেন। মায়ের চোখের সামনে তখন ছােট্ট বেলাকার শিবাজী। শিবনেরির মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে চলা লাফাতে লাফাতে খেলতে খেলতে বড় হওয়ার দৃশ্য ভেসে উঠেছিল। শিবাজী আজ ছত্রপতি মহারাজ হয়েছে। মায়ের মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত। জিজাবাসি তার চোখের সামনে মােগলদের দ্বারা ধর্মস্থল অপবিত্র ও মা-বােনেদের কলঙ্কিত হতে দেখেছেন। সেদিন তিনি মা ভবানীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন পুত্রকে দিয়ে এর প্রতিকার করাবেন। সেদিন তিনি স্বাধীন হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আজ তাঁর স্বপ্ন সত্য হতে চলেছে।

মাতৃ বন্দনা শেষে শিবাজী মহারাজ  রাজসভার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন। সভায় তিল ধারণের ও স্থান নেই। রাজ পরিষদ-সহ শিবাজী রাজসভায় প্রবেশ করে বেদীর কাছে এসে পৌঁছলেন। ভূমির উপর ডান হাঁটু মুড়ে বসে সিংহাসনকে বন্দনা করলেন। অষ্টপ্রধানরা নিজ নিজ স্থানে গিয়ে দাঁড়ালেন। শুভ মুহূর্তটি দর্শনের জন্য সকলের চোখ তখন সিংহাসনের দিকে। গাগাভট্ট এবং অন্য পণ্ডিতরা উচ্চৈঃস্বরে বেদমন্ত্র পাঠকরে চলেছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত উপস্থিত হতে চলেছে। জ্যৈষ্ঠ শুক্লা ত্রয়ােদশী শনিবার, সকাল ৫টায় মহারাজ সিংহাসনে উপবেশন করলেন। মহারাজের মাথার উপর ছত্র ধারণ করে গাগাভট্ট ঘােষণা করলেন  ‘মহারাজ সিংহাসনাধীশ্বর ক্ষত্রিয় কুলবৎস রাজা শিবাজী মহারাজ ছত্রপতি কী জয়। তিনবার তােপধ্বনি হলাে। নহবত, সানাই, শিঙ্গা, কর্ণসব এক সঙ্গে বেজে উঠল। হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হলাে ‘রাজা ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ কী জয়। ফুল চন্দন, সুগন্ধী। বর্ষিত হতে লাগল। রাজ্যের সমস্ত দুর্গে ঠিক একই মুহূর্তে একসঙ্গে তােপধ্বনি হলাে, মহারাজের জয়গান ঘােষণা হলাে। আর সেই তােপধ্বনি দিল্লির সুলতানের হৃম্প ধরালাে। মােগল সম্রাটের ঘুম ভেঙে গেল।

প্রসন্ন চিত্তে সিংহাসনে উপবিষ্ট ছত্রপতি  শিবাজী মহারাজকে চন্দন কুমকুম ও পঞ্চপ্রদীপ দিয়ে ১৬ জন কুমারী-সহ মায়েরা বরণ করলেন এবং তিলক এঁকে দিলেন। অন্য মহিলারা বলতে লাগলেন, ‘রাজা হয়েছেন শিবরাজ। এখন আমাদের ভয় কীসের ? প্রধানমন্ত্রী মােরপন্ত ৮ হাজার সুবর্ণমুদ্রা দিয়ে মহারাজকে অভিষেক করালেন। সবাই উপহার দিতে লাগলেন। সিংহাসনের পাশে উপহারের পাহাড় জমতে লাগল। উপহার পর্ব সমাপ্ত হওয়ার পর সকলে নিজ নিজ আসনে বসলেন। প্রধানমন্ত্রী ঘােষণা করলেন, ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের এটাই প্রথম দরবার।

রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান শেষ হতে চার ঘণ্টা লাগল। মহারাজের শােভাযাত্রার সমস্ত ব্যবস্থা হয়ে গেছে। সুসজ্জিত সাদা হাতির উপর মহারাজ বসলেন। পেছনে প্রধানমন্ত্রী মাের পন্ত , সামনে প্রধান সেনাপতি হাতিম্বররাও মােহিত। সামনে পেছনে রাজচিহ্ন এবং পতাকা। মহারাজের নামে জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছে। হাতিরসামনে পেছনে এক হাজার সৈনিক। নিজ নিজ পদ্ধতিতে অষ্টপ্রধান ও অন্য পদাধিকারীরা চলেছেন। একেবারে সামনে রাজ নহবত বাজছে। সবশেষে মহারাজের ঘােড়সওয়ার বাহিনী। বাদ্যযন্ত্র এবং জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। সুসজ্জিত তােরণ-শােভিত রাজপথ দিয়ে চলেছে শােভাযাত্রা। যেন সমস্ত মহারাষ্ট্র রাস্তার দু'ধারে দাঁড়িয়ে শিবাজী মহারাজের জয় ঘােষণা করছে। শােভাযাত্রা শেষ হলাে। শিবাজী মহারাজের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম  হিন্দু সাম্রাজ্যের রাজধানী রায়গড়ে প্রতিষ্ঠিত হলাে।

বিজাপুর রাজ্যের সামান্য জায়গিরদার  শাহজী ভোসলের পুত্র শিবাজী (১৬১৭ - ১৬৮০)। তিনি প্রথমে দক্ষিণে বিজাপুরের মুসলমান রাজ্যগুলির সঙ্গে  সংগ্রাম করে হিন্দু সাম্রাজ্য দক্ষিণ পশ্চিম ও দক্ষিণ পূর্ব ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত করেন। নিজস্ব শাসনাধীন অঞ্চল ছাড়াও তিনি মােগল ও বিজাপুরের বিস্তৃত অঞ্চল থেকে চৌথ ও সরদেশমুখী নামে দুটি কর সংগ্রহ করতেন। শিবাজীর সাম্রাজ্যের শক্তির মূল উ ৎস ছিল বিভিন্ন মারাঠা সেনাপতি দের নিয়ে গঠিত মারাঠা রাজ্যসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা। আচার্য যদুনাথ সরকারের মতে, ‘শিবাজী পরমাণুর মতাে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত মারাঠা জাতিকে একটি শক্তিমান জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। এবং তিনিই আধুনিক আত্মসচেতন হিন্দু জাতির পূর্ণ অভিব্যক্তি লাভের দীক্ষাদাতা।

লিখেছেনঃ ডাঃ শচীন্দ্রনাথ সিংহ
(লেখক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ক্ষেত্রীয় সংগঠক) (হিন্দু সাম্রাজ্য দিনােৎসব অর্থাৎ শিবাজী মহারাজের রাজ্যাভিষেক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ প্রবন্ধ)

Previous
Next Post »