নারকেল সংস্কৃতি ও ভারতীয় ঐতিহ্য।

নারকেল সংস্কৃতি ও ভারতীয় ঐতিহ্য।

নারকেলকে বলা হয় কল্পবৃক্ষ' অর্থাৎ স্বর্গের উদ্ভিদ। এর উপযােগিতা কেবল খাদ্য, পানীয় এবং আশ্রয়কেন্দ্রিক নয়। একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের অন্যতম কাচামাল জোগানদায়ী উদ্ভিদ হলাে নারকেল। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এর মাহাত্ম এই সত্যের উপর প্রত্যয়িত যে নারকেল সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করা হয় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে।

নারকেল সংস্কৃতি ও ভারতীয় ঐতিহ্য।
নারকেল সংস্কৃতি ও ভারতীয় ঐতিহ্য।

২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নারকেল দিবস। প্রতি বছরই বিশ্ব নারকেল দিবসের একটিবার্তা থাকে। গত বছরের তাৎপর্য যে মূল রাগিণীতে বাঁধা হয়েছিল তা হলাে : পারিবারিক সমৃদ্ধির পরিপুষ্টির জন্য জীবনবৃক্ষ নারকেল; Coconut, the tree of life sustains family well being. এই দিনটি আসলে নারকেল ফসল থেকে সম্বৎসর মানবসভ্যতা কীভাবে উপকৃত হয়, তারই ধন্যবাদাত্মক দিবস, Thanks giving day of coconut. কেবলমাত্র ভারতবাসীই যেদিনটি পালন করে তা নয়, এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় নানান দেশ ও জাতি এদিন এই বৃক্ষপূজায় ব্রতী হয়েছে। হ্যা,আমি একে পুজোই বলবাে; tree worship, বৃক্ষপুজো, প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য।

প্রাচীন শাস্ত্রকারেরা বলছেন, একো বৃক্ষো দশঃ পুত্র সমাচারেৎ অর্থাৎ এক বৃক্ষ দশ পুত্রের সমতুল্য। আমরা আন্দাজ করতে পারি মানুষ বৃক্ষ থেকে, বিশেষ করে কল্পবৃক্ষ থেকে কত উপকার গ্রহণ করলে এমন কৃতজ্ঞতায় কাব্য রচনা করতে পারেন। উপনিষদে আছে ‘পশ্য দেবস্য কাব্যম্, অর্থাৎ তােমরা দেবতার রচিত কাব্য দেখাে। কোন সেই কাব্য? ধরা যাক আরব সাগরের বুকে লাক্ষাদ্বীপ কিংবা বঙ্গোপসাগরের বুকে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের গহন নারকেল বৃক্ষরাজি। হ্যা, সেই বাগিচা, সেইনীল আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া নারকেলের পল্লবরাজি তাে দেবতার রচিত কাব্যই বটে।


সবাই জানেন, গােয়া, দমন, দিউ এবং মহারাষ্ট্রের মানুষ নারকেল ফলকে ‘শিব’বলে মনে করেন। কারণ খােসা ছাড়ানাে নারকেল মালাইয়ে তিনটি চোখ দেখা যায়, যা শিবের ত্রিনয়নকে মনে করিয়ে দেয়। ওই অঞ্চলের মানুষ আগস্ট-সেপ্টেম্বর বা ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে ‘নারকেল পূর্ণিমা পালন করে। সারা বছর সমুদ্রের দেবতা বরুণ এই অঞ্চলের মানুষদের মাছ দিয়ে বাঁচান। প্রতিদানে নারকেল পূর্ণিমায় এখানকার মানুষ নারকেল ভেঙে আরবসাগরের তীরে গিয়ে সমুদ্র জাগায়’ আর নারকেল উৎসর্গ করে। এই আচারের উদ্দেশ্য দুটি—প্রথম,সমুদ্র বা বরুণ দেবের সঙ্গে মহাদেবের মিলন; দ্বিতীয়, বরুণ দেবতার সন্তান মাছেদের সুষম আহার প্রদান। হ্যা,এই পুণ্যদিনে সম্পূর্ণ ফল ও শাঁসদুই-ই সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। ছােবড়া-সহ গােটা ফল সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এক সময় দূর দিগন্তে পৌঁছে স্বাভাবিক নারকেল বন গড়ে উঠবে এই ছিল উদ্দেশ্য।

খাবার হয়ে উঠবে তার মনােরম শাস এ তাে প্রকৃতিচর্যার এক অনন্য উৎসব। সেই প্রাচীন প্রথা মনে রেখেই তারই কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব নারকেল দিবস। অনেকটা প্রাচীন ঐতিহ্যকেনব নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ বলে মনে হয়, New construction of myth or reconstruction of myth Asia & Pacific Coconut Committee অর্থাৎ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নারকেল  গােষ্ঠী যার মূলকেন্দ্র ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা,  তারাই এই নারকেল দিবসের বিশ্ব-আহ্বায়ক।  ২ সেপ্টেম্বর ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা দিবসও বটে। এটি একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ব সংস্থা, যার সদস্য দেশ ১৮, তারা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নারকেল উৎপাদন বলয়ে এই ফসলের উন্নয়ন, সমন্বয়সাধন ও একসূত্রীকরণের ভরসা। এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে, নারকেল এক প্রাচুর্যময় উদ্ভিদ, Tree of Abundance. এই দিনটি মনে করিয়ে দেবে, দারিদ্র দূরীকরণে নারকেল এক অনবদ্য প্রাকৃতিক দান। ভারতবর্ষে নারকেল উন্নয়ন পর্ষদ বা Coconut Development Board এই দিনটিকে নানাভাবে উদ্যাপনের পথিকৃৎ। এই দিনটি পালন তখনই সার্থকতা লাভ করবে যখন নারকেল চাষ ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কৃষিজীবী পরিবার তাদের আয় বাড়াতে সক্ষম হবে, নারকেল চাষ ও নানান সামগ্রী রপ্তানির মাধ্যমে ভারত প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সমর্থ হবে।

লিখেছেনঃ ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

Previous
Next Post »