হিন্দুই ভারতবর্ষের জাতীয়তা

হিন্দুই ভারতবর্ষের জাতীয়তা

স্বামীজী আমেরিকাতে যাওয়ার আগে সারা ভারত পায়ে হেঁটে ঘুরেছিলেন। বুঝেছিলেন, এই পরানুবাদ, পরমুখাপেক্ষা, এই দাসসুলভ দুর্বলতা আর এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতাকে সম্বল করে একটা জাতি উচ্চাধিকার লাভ করতে পারবে না। জাতিটাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে গেলে একেবারে নিজের ভেতরকার গর্ব করার মতাে কিছু সামনে আনতে হবে। এমন কিছু সম্পদ যা কেবল ভারতের নিজস্ব। যার বলে ভারত বলতে পারে, পৃথিবীকে সে এমন কিছু দিতে পারে যা অন্য কারাের নেই। সারা দেশ ঘুরে ভারতের শেষ সীমা কন্যাকুমারীতে পৌঁছে স্বামী বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতের সেই অনন্য ধন হলাে হিন্দুত্ব। সহস্র সহস্র বছরের সাধনার ধন, যা পৃথিবীকে বাঁচতে শেখাবে। এই যে বহু উপাসনা পদ্ধতি, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির মানবসমাজতারশান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথই হলাে হিন্দুত্ব। হিন্দুত্ব কোনাে উপাসনা পদ্ধতি নয়। এক জীবনধারা যা কেবল অপার সহিষ্ণুতাই নয়-- যাতে আছে অপরকে আপন করার অসীম ক্ষমতা।

হিন্দুই ভারতবর্ষের জাতীয়তা
হিন্দুই ভারতবর্ষের জাতীয়তা

পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আত্মপরিচয় প্রবন্ধে পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, এই হিন্দুত্বই ভারতবর্ষের জাতিগত উত্তরাধিকার। ভগিনী নিবেদিতা ‘অ্যাগ্রেসিভ হিন্দুইজমের উপর লিখেছেন সম্পূর্ণ একটি গ্রন্থ। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভগিনী নিবেদিতারা বুঝেছিলেন যে হিন্দুত্বই ভারতবর্ষের চালিকা শক্তি। হিন্দুত্ব ভারতবর্ষকে অজেয় শক্তি দিয়েছে। ভারতবর্ষে এক হাজার বছরের আরব সাম্রাজ্যবাদ আর দুশাে বছরের ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের পরেও প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি।জাতিভেদের মতাে কর্কটরােগ শরীরে নিয়েও দুদুটি ভয়ানক সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে লড়ে জিতে গেছে ভারতবর্ষ আর এই জেতার সঞ্জীবনী মন্ত্র হলাে হিন্দুত্ব। স্বামীজী বলতেন ভারতবাসীর মূল হল ধর্ম। এরা কোনাে কিছুর বিনিময়েই সত্যকে, ধর্মকে ছাড়েনি। ভারতবাসীর ধর্ম, এই হিন্দুধর্মকে বিশ্বধর্মমহাসভায় বলা প্রয়ােজন। ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছ থেকে এমন আদেশই পেলেন স্বামী বিবেকানন্দ কন্যাকুমারীর ওই শিলাখণ্ডে বসে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরেই ঠিক করলেন আমেরিকা যাবেন। তার পরে দেশে-বিদেশে অনেক অপেক্ষা, সংগ্রামের পরে পৌঁছেছিলেন শিকাগাের কলম্বাস হলের পােডিয়ামে একজন পরাধীন দেশের, ভারতীয় হিন্দু সন্ন্যাসীর সেই জয়ের কাহিনি এখনাে যুবমনকে সমানভাবে আলােড়িত করে।


স্বামীজীর শিকাগাে বক্তৃতা ভারতকে কী দিয়েছিল? সর্বপ্রথম ভারতবাসীর মনে এক প্রত্যয় জাগিয়ে ছিলেন স্বামীজী। স্বামীজীর আগেই ভারতের নবজাগরণের দীপশিখা জ্বলে উঠেছিল ঠিকই, তবে সেযুগের প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীরাও ভাবতে পারতেন না যে ভারতের দেবার মতাে কিছু আছে। ভারত কেবল পশ্চিমের কাছে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে যাবার জন্য টিকে নেই, বরং ঈশ্বরের ভারতবর্ষকে এত কঠিন অবস্থার মধ্যেও বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে অন্য কোনাে পরিকল্পনা আছে। ভারত বেঁচে আছে বলেই, মানবসভ্যতা বেঁচে থাকবে। বিবেকানন্দ উন্নত বিশ্বের সর্বোন্নত দেশের সর্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বললেন, তােমরা যখন জঙ্গলের ডালে ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছ, তখন আমরা সভ্যতার পথে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি। এই এগিয়ে যাওয়াটা কোন পথে? সেটা বৈদিক মুনিঋষিদের পথ আর কণাদ, ভাস্কর, আর্যভট্টের, শুতের মত বৈজ্ঞানিক তপস্বীদের পথ। এই সব ভাবনার মধ্যে এক জীবনবােধ আছে। তা হলাে ধর্ম। তাই স্বামীজী বিশ্বধর্মমহাসভায় সােজাসাপটা হিন্দুধর্ম হিন্দুত্বের কথাই বলেছিলেন।


Previous
Next Post »