ইতিহাসের কথায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির।

ইতিহাসের কথায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির।

নীলাচল নিবাসায় নিত্যায় পরমাত্মনে।
বলভদ্র সুভদ্রাভ্যাং জগন্নাথায় ‘তে নমঃ।।

স্মরণাতীত কাল থেকে অগণিত ভক্তের দল প্রভু জগন্নাথ বলভদ্র সুভদ্রার প্রতি এমনি করেই প্রণতি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এই নীলাচল পতি নীলমাধবের সন্ধান লাভ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে অত সহজ হয়নি। কাহিনি সেরকমই রয়েছে। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তার আরাধ্য দেবতা ভগবান বিষ্ণুর নীলমাধব রূপে অবস্থানের কথা জানতে পেরে প্রধান পুরােহিত বিদ্যাবতীকে পাঠালেন তার সন্ধান করতে। বিদ্যাবতী ঘুরতে ঘুরতে শবর প্রধান বিশ্বাবসুর গৃহে অতিথি হলেন। কালান্তরে তার কন্যা ললিতার সঙ্গে বিবাহ হলাে তার। এক সময় বিদ্যাবতী সন্ধান পেলেন বিশ্বাবসু নীলাচল পর্বতের কোনও গুহায় গােপনে নিত্যনীলমাধবের পূজার্চনা করেন। খবর শুনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তার গুহায় উপস্থিত হয়ে দেখলেন দেবমূর্তি অন্তর্হিত। দেবদর্শনে আমৃত্যু অনশন ব্রত গ্রহণ করলেন তিনি। একদিন স্বপ্নাদেশ পেলেন দারুমুর্তি নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য। এমন ভাবেই তৈরি হয়েছে ভক্ত আর ভগবানের কালজয়ী ইতিহাস। শ্রীশ্রী জগন্নাথের লীলাক্ষেত্র এই ধামকে বলা হয় জগন্নাথপুরী, সংক্ষেপে পুরী। কিন্তু পুরুষােত্তম ক্ষেত্র, ক্ষেত্র, শ্রীক্ষেত্র, নীলাচল ইত্যাদি নামেও প্রসিদ্ধ এই তীর্থধাম। ওড়িশার রাজকাহিনির প্রামাণিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ‘মাদলা পাঁজি’ থেকে (তালপাতার পুথি)। তাছাড়া মৈহর শিলা লেখ, নাগপুর শিলালেখ ও পূজারি পালী শিলালেখ থেকেও বহু ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া গেছে।

ইতিহাসের কথায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির।
ইতিহাসের কথায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির।

প্রথম শতাব্দীতে কলিঙ্গাধিপতিরূপে পাওয়া যায় মারবেন এর নাম। নিজে জৈন্য ধর্মাবলম্বী হয়েও বহু হিন্দুমন্দির তিনি নির্মাণ করেন, মারবেনের পরে তিন'শ বছরের ইতিহাস প্রায় অবলুপ্ত, চতুর্থ শতাব্দীতে দক্ষিণ ওড়িশায় মারাঠা বংশের উত্থানের কথা পাওয়া যায়। যথাসম্ভব কলিঙ্গ অধিকারের পরে তারাই প্রথম শ্রীজগন্নাথকে বাসুদেব নারায়ণ রূপে পূজা করেন। সপ্তম শতাব্দীতে শৈলােদ্ভব বংশের রাজা মাধবরাজ গুপ্ত দ্বিতীয় (৬২০-৬৫০ খ্রি:) সমুদ্র পাড়ে মন্দির নির্মাণ করে নীলমাধবের পুজার্চনা করতেন বলে কথিত। শ্রী পুরুষােত্তম জগন্নাথদেবের পূজার্চনার উল্লেখ পাই চন্দিলারাজ কীর্তিবর্মণের রাজত্বকালে (১০৪১-১০৭০)। পুরীধাম চিরদিনই সর্বত-সমন্বয় ক্ষেত্র। ভৌমকর রাজারা ছিলেন এর বড় প্রমাণ (৭৩৬ খ্রি:)। বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী হলেও তারা বৈষ্ণব ও শৈব ধর্মের প্রতি ছিলেন সমান অনুরাগী। এই সময় তন্ত্রসাধনারও প্রসার ঘটে এখানে। দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে (৯২৩ খ্রি:) ভৌমকর বংশের পতন হলে দক্ষিণ কোশলের শক্তিশালী সােমবংশীয় রাজা যতাতিকেশরী ওড়িশা অধিকার করেন। যতাতিকেশরীই পুরীতে মাঝারি একটি জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেন বলে কথিত। সােমবংশীয় রাজাদের সময়েই নির্মিত হয় ভুবনেশ্বর লিঙ্গরাজ মন্দির, নির্মিত হয় জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন নৃসিংহ মন্দির (৬০ ফুট)।


পুরীর উপরে প্রথম বহিঃশত্রু মুসলমান আক্রমণ হয় যতি কেশরীর ১৪৬ বছর আগে। জলপথে এসে সমগ্র পুরী ধ্বংস করে রক্তবাহু, নৃশংস হত্যা আর রক্তের স্রোত বইয়ে দেয়। সে সময় জগন্নাথ বলভদ্র সুভদ্রার মূর্তি গােপানী নামক গ্রামে কোনও এক কুটিরে লুকিয়ে রেখে পূজা করা হয়। এরপরে ক্রমান্বয়ে আক্রমণ। উপায়ন্তর না দেখে পূজারীরা মূর্তি পালি’ করে অর্থাৎ মাটি চাপা দিয়ে রাখে, চিহ্ন হিসেবে উপরে পুঁতে দেয় এক বটের চারা। এই সঙ্কটকালে ১৪০ বছর প্রায় জগন্নাথদেবের পূজার্চনা বন্ধ ছিল। যযাতিকেশরী প্রথমই এই মূর্তির সন্ধান করে দেববিগ্রহের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পূজার্চনা শুরু করেন।


মাদলা পাঁজিতে বর্ণিত হয়েছে নেপালরাজ শঙ্করাচার্য এবং পুরীরাজের হাতে তিনটি অমূল্য শালগ্রাম
শিলা তুলে দেন। এই শিলা তিনটি প্রভু  জগন্নাথ বলভদ্র সুভদ্রার দারুমূর্তির বক্ষদেশে স্থাপন করা হয়। একে বলা হয় “ব্রহ্ম। নেপাল রাজ তাই পুরীতে এলে পুরীরাজের সমান সম্মান পান এই ব্রহ্মা দানের জন্য। 

চোড়গঙ্গাদেব বা রাজা অনন্তবর্মণের | রাজত্বকাল (১১৯২ খ্রি:) ওড়িশার ইতিহাসে স্মরণীয়। “পরম বৈষ্ণব’ উপাধি নিয়ে তিনি যেমন এক উচ্চ মার্গের সাধন ক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন পুরীকে, তেমনি তার  শৌর্য বীর্যের প্রতাপে পরবর্তী তিনশ বছর বহু আক্রমণ সত্তেও ওড়িশাকে কখনও মুসলমান  শাসনের অধিকারে আনা সম্ভব হয়নি। এই মহাপ্রতাপী ভক্তপ্রবর রাজ্য অনন্তবর্মণই পুরীর মূল জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ শুরু করেন, এই  মন্দির নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয় তার সপ্তম পুরুষ রাজা অনঙ্গ ভীমদেবের সময়ে  (১২১১-১২৪২ খ্রি:)। 

 ‘মাদলাপাঁজি’ ও ‘সিরাজ ই ফিরােজ শাহীর বর্ণনা অনুযায়ী ভানদেব তৃতীয়ের  (১৩৫৮-১৩৭৮) কয়েকজন সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মুসলমান আগ্রাসনকারীরা ওড়িশায় প্রবেশের সুযােগ পায় চলতে থাকে মন্দিরের উপর অত্যাচার, ধ্বংসলীলা। মারাঠা শক্তি ওড়িশার দখল না নেওয়া পর্যন্ত এর কোনও পরিবর্তন হয়নি।

গজপতিরাজা প্রতাপরুদ্রর সময়কে  (১৪৯৭ খ্রি:) বলা যায় ওড়িশা তথা পুরীর এক স্বর্ণযুগ। ওড়িশার রাজ্যভার গ্রহণ করার পরে তার ভক্তির গভীরতা ও কর্মকুশলতায় পুরী তীর্থযাত্রীদের কাছে হয়ে ওঠে অধিকতর আকর্ষণীয়, পরমপ্রাপ্তির এক ধামরূপে। এই সময়ই মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের নীলাচল লীলা কাল। তার উপস্থিতিতে পুরী ভক্তির বন্যায় প্লাবিত হয়ে উঠে। গৌড়ের রাজা হুশেন শাহ প্রতাপরুদ্রর রাজত্বকালেই পুরী আক্রমণ করেন (১৫০৯ খ্রি:), যথেষ্ট ক্ষয় ক্ষতি হয়। প্রতাপরুদ্র ওই সময় দক্ষিণ দেশে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সুযােগে এই আক্রমণ। প্রতাপরুদ্র ফিরে আসায় সমাচার পেতেই ফিরে যান হুশেন শাহ। কিছু ঐতিহাসিকের মতে অবশ্য এই আক্রমণকারী ছিল হুসেন শাহর সেনাপতি ইসমাইল গাজি। ধ্বংসলীলার প্রতীক কালাপাহাড় যখন পুরী আক্রমণ করে তখন ওড়িশায় চালুক্যবংশের মুকুন্দদেব হরিচন্দন রাজত্ব করেছিলেন।

মুকুন্দদেব যখন অন্য সেনাপতি সিকন্দর উজবেগের সঙ্গে অন্যত্র যুদ্ধে ব্যস্ত, সেই সুযােগে কালাপাহাড় পুরী ও মন্দির আক্রমণ করে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালায়। নির্মম ভাবে চলে তার হত্যালীলা। লুকোনো জায়গা থেকে জগন্নাথ বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তিকে হাতীর পিঠে বেঁধে নিয়ে গঙ্গার পাড়ে অর্ধদগ্ধ করে জলে ফেলে দেয়। বিসরা মহান্তি নামে এক ভক্ত সাহসে ভরকরেওই অর্ধদগ্ধবিগ্রহ থেকে ‘ব্রহ্ম উদ্ধার করে কুজঙ্গগড় নামক স্থানে লুকিয়ে রাখে। ওড়িশা আফগান অধিকারে গেলে তাদের অত্যাচারে ১৫৬৮ থেকে ১৫ ৯২ খ্রি: পর্যন্ত মন্দিরে কোনও বিগ্রহ ছিল না। সম্রাট আকবরের দখলে ওড়িশা এলে তার সেনাপতি মানসিংহ পুনঃ মন্দিরে পূজার্চনার সুবন্দোবস্ত করেন। ঔরঙ্গজেবের সময় আবার আক্রমণের ঢল। কালাপাহাড়ের পরে লম্বা আক্রমণকারীদের তালিকা যারা নিরন্তর পুরীর মন্দিরের আঘাতের পর আঘাত হেনেছে নির্মম ভাবে। সুলেমান ও ওসমান, মির্জা সুনাম (বাংলার নবাব ইসলাম খানের সেনাপতি ১৬০২ খ্রি:), হাসিম খান (১৬০৮ খ্রি:), কেপােলাসমারু (এক দুর্ভাগা রাজপুত জায়গিরদার) কল্যাণ মাল্লা মুকারম খান (১৬১২ খ্রি:) ইত্যদি। এ হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে ভক্তের ভগবানকে রক্ষার লড়াই। ভক্তি নিষ্ঠা ত্যাগ শৌর্যের অনন্য কাহিনী। মারাঠা রাজত্বে (১৭৫২ খ্রি:) অবস্থার পরিবর্তন হয়। অগণিত ওড়িশাবাসী ভক্ত একটু শান্তি অনুভব করে। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর ওড়িশা ব্রিটিশ অধিকারে আসে। আপাতভাবে তারা মন্দিরের কোনও ক্ষতিসাধন করেননি, বরং মন্দির পরিচালনা ও পূজার্চনার সুব্যবস্থায় নানা পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। কিন্তু পরােক্ষে আক্রমণ করেছে মিশনারিগণ রথযাত্রার সম্পর্কে কদর্য ভাষায় কুৎসা প্রচার করে। এ কাজটির মূল হােতা ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ামের যাজক ক্লডিয়াস বুকালন। উইলিয়াম ব্যাম্পটন নামে এক ইংরেজ মিশনারি ১৯০৩ সালে পুরীতে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন ‘অদ্ভুত চেহারার জগন্নাথের একদিন পতন ঘটবেই...।'

যুগ যুগ ধরে নিরন্তর পুরীর মন্দিরের উপরে আক্রমণের পেছনে কারণ কী ছিল? 

(১) মন্দিরের অতুল ধনসম্পদ লুণ্ঠন, (২) হিন্দু ভারতের মর্মস্থলে তাদের বিশ্বাসে আঘাত করা, তাদের শ্রদ্ধাকেন্দ্রকে অসম্মানিত করে সাধারণ মানুষের মনােবল ভেঙে দেওয়া। এসব সত্ত্বেও জগন্নাথ দর্শনে ভক্তপ্রবাহের শান্তি নেই। ভারতবর্ষের সাধক চুড়ামণি ধর্মাচার্যগণ একবার না একবার সকলেই জগন্নাথ দর্শনে এসেছেন শঙ্করাচার্য, মাধবাচার্য, নিম্বার্কাচার্য, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, প্রভু বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী, মা আনন্দময়ী এমন কত বিভূতি! জৈন, শৈব, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব ভাবপ্রবাহের এক অবিমিশ্র রূপ দেখি পুরীধামে। জাতি বর্ণ ভাষা বেশ উচ্চ নীচ সকল বিভেদের উধের্ব উঠে সকল মতের সমন্বয় সাধনের এক তীর্থ ক্ষেত্ৰ জগন্নাথ পুরী। এই শাশ্বত সত্যের কেন্দ্রভূমি, সাধনভূমি তাই এমন অজেয় শক্তি সমন্বিত। পতিতপাবন ভগবানের রথের দড়িকে স্পর্শ করে সহস্র ভক্তবৃন্দ যখন বলে ওঠে
 ‘জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথগামী ভবতু মে...';   তখন যেদিব্যভাব আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে সমগ্র জগতকে ব্যাপ্ত করে, সে দিব্যভাবের স্পর্শ লাভে আজও রথযাত্রায় উন্মুখ হয়ে থাকে বিশ্ব। এক অমােঘ আকর্ষণে সকলে ছুটে চলে জগন্নাথ ধামের দিকে।

লিখেছেনঃ বিমলকৃষ্ণ দাস

Previous
Next Post »