Shivratri পালনের উদ্দেশ্য সকলের মঙ্গলকামনা।

Shivratri পালনের উদ্দেশ্য সকলের মঙ্গলকামনা।

Shivratri শুভরাত্রি। সর্বমঙ্গল রাত্রি। এই রাত্রি মুক্তিরাত্রিও বটে। মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর এই রাত্রিতে ব্রহ্ম এবং বিষ্ণু অর্চনা করেছিলেন মহেশ্বরের। তুষ্ট হয়ে মহেশ্বর বলেন, তােমাদের আজকের পূজায় আমি পরিতৃপ্ত, পরমানন্দিত। তাই আজ থেকে এই দিনটি হবে শ্রেষ্ঠতম দিন। আমার অতিপ্রিয় এই তিথিটি চিরকাল আখ্যাত হবে Shivratri রূপে। সর্বজীবের মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ হবে এই তিথি।

শিবরাত্রি পালনের উদ্দেশ্য সকলের মঙ্গলকামনা।
শিবরাত্রি পালনের উদ্দেশ্য সকলের মঙ্গলকামনা।

মাঘের কৃষ্ণা চতুর্দশীকে শিরাত্রি হিসেবে চিহ্নিত করার একটি ইতিহাস আছে। একবার ব্রহ্ম এবং বিষ্ণু নিতান্ত তুচ্ছ কারণে অথবা শিবের মায়াশক্তির প্রভাবেই এক ভয়ঙ্কর কাজে জড়িয়ে পড়লেন। দুজনেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে থাকেন। প্রথমে কথা কাটাকাটি, পরে হাতাহাতি। তাতেও শেষ হয় না বিবাদ। এক সর্বনাশা অহংবােধে দুজনেই হাতে তুলে নেন মহাস্ত্র। বিষ্ণু চালনা করেন মহেশ্বর অস্ত্র আর ব্রহ্ম নিক্ষেপ করেন পাশুপত অস্ত্র। অমােঘ সেই পারমাণবিক অস্ত্রে জগৎ দাঁড়ায় ধ্বংসের মুখে।

সেই সময় দেবতারা গিয়ে শরণ নেন মহাদেবের কাছে।  বলেন, রক্ষা করুন, নাহলে বিনষ্ট হবে সৃষ্টি। রসাতলে যাবে সবকিছু। মহেশ্বর সবই জেনেছিলেন আগে। তবুও দেবতাদের প্রার্থনায় হােসে অভয় দেন। তারপর সেই পরস্পর সংঘর্ষমুখী অস্ত্রের মাঝখানে দেখা দেন অনলস্তম্ভ রূপে। দুই অস্ত্রই বিলীন হয় সেই অনলস্তম্ভে।

ঘটনার আকস্মিকতায় ব্রহ্মা-বিষ্ণু হতচকিত হতদম্ভও। এই ব্রিটের সামনে তারা যে অতি নগণ্য এই বােধ তাঁদের বিনত করল। কৌতুহলীও  তারা জানতে চান এই অনলস্তম্ভের আদি এবং অন্ত। তাই আর যুদ্ধ নয়। পারস্পরিক আলােচনায় হংসেবাহন ব্রহ্মা চললেন। মুর্তির অন্ত সন্ধানে আর বিষ্ণু ক্লাহরূপে যান মূর্তির উৎস বা মূলের খোঁজে।

বৃথা সে অনুসন্ধান অথবা আত্মজ্ঞান লাভের সেই অভিযাত্রা। বিষ্ণু বরাহ রূপে পাতালের অর্ধেদেশে গিয়ে সন্ধান পান না সেই অনলক্তম্ভের মুলের। ব্যর্থ, পরিশ্রান্ত বিষ্ণু আবার ফিরে আসেন সেই রণস্থলেই।  ব্ৰহ্মাও তার হাঁসে চেপে অনেক অনেক উর্ধ্বে উঠেও দেখা পান না সে স্তম্ভশীর্যের। ব্রহ্মাও ক্লান্ত। তারই মধ্যে দেখেন একটি কেতকী ফুল নেমে আসছে। প্রশ্ন করে জানতে পারেন বহু-বহুদিন আগে ওই স্তম্ভের মধ্য থেকে এই কেতকী আধােগামী। কিন্তু আজও এর আদি দেখতে পায়নি।


দুষ্টুবুদ্ধি চাপে ব্রহ্মর মাথায়। চালাকিতে বাজিমাত করতে চান তিনি। তাই কেতকীকে বলেন, তাকে মিথ্যা সাক্ষী হতে হবে। বিষ্ণুর কাছে গিয়ে বলতে হবে ব্রহ্মা স্তম্ভের শীর্ষ বা অন্ত দর্শন করেছেন। রাজি হন কেতকী। বলেনও তাই। নিজের ব্যর্থতায় হতাশ বিষ্ণু ব্রহ্মর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে চান। আর ঠিক তখনই সেই স্তম্ভ থেকে আবির্ভূত হন মহাদেব রুদ্রমূর্তি। তখন তার বিষ্ণুর সত্যভাষণের জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। আর তীব্রস্বরে ভৎর্সনা করেন ব্রহ্মকে। তার জ্ব থেকে আবির্ভূত হয় ভৈরব। শঙ্করের নির্দেশে ব্রহ্মা যে মুখ দিয়ে অনৃত বাক্য উচ্চারণ করেন সেই পঞ্চম মাথাটি কেটে নেন। সেদিন থেকে ব্রহ্মা হন চতুরানন।

ব্রহ্মার কাতর প্রার্থনায় শান্ত হন আশুতােষ। নিরস্ত করেন ভৈরবকে। ব্ৰহ্মকে বলেন, পুজো পাওয়ার লােভে তুমি এই কপটতার আশ্রয় নিয়েছিলে। মিথ্যে বলেছিলে, এরই শাস্তি হিসেবে আজ থেকে বিশ্বে কোথাও তােমার আর আলাদা কোনও পুজো উৎসব হবে না। আন্তরিক অনুতাপে জ্বলে ব্ৰহ্ম মেনে নেন সে শক্তি। কাতর ভাবে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন। শিব তখন শান্ত ভাবে বললেন, দেখ, রাজদণ্ডের ভয় না থাকলে এ জগৎ বিনষ্ট হয়ে যেত। রাজদণ্ডের ভয়েই জগৎ চলে নিয়ম মতে। সেদিন মহাদেব আরও বলেন, অগ্রহায়ণ মাসে আদ্রা নক্ষত্রে তার প্রতিষ্ঠা উৎসব পালন করলে তা হবে অত্যন্ত মঙ্গলদায়ক।

শিবপুরাণের বিদ্যেশ্বর সংহিতার এই বিব্রণ থেকে জানা যায়, তিনি অনলস্তম্ভ বা লিঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হন অগ্রহায়ণের আত্রা নক্ষত্রে আর ব্রহ্মা ও বিষ্ণু মিলিত ভাবে তার পূজা অর্চনা করেন মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে। ইশান সংহিতায় আছে, ওই তিথির মহানিশায় কোটি সুর্যের মতাে উজ্জ্বল শিবলিঙ্গ দেখা গিয়েছিল। আর মহেশ্বর স্বয়ং এই দিনটি Shivratri হিসেবে পালন করার নির্দেশ দেন। বলেন, এই দিন যিনি তার লিঙ্গ বা প্রতিমূর্তিতে পুজো করবেন তিনি হবেন অশেষ পুণ্যের অধিকারী। যিনি কাউকে বঞ্চনা করেন না, তিনি Shivratri দিনে সংযত চিত্তে অহােরাত্র পুজো করলে এক বছর নিয়মিত পুজো করার পুণ্যের অধিকারী হন।

Shivratri উদ্ভব বা প্রচলনের এই হলাে ইতিহাস। এটি এমন একটা পূজা-উৎসব যা সারা ভারতের সব জাতি, সব বর্ণ ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে পালন করেন। Shivratri একটি সর্বভারতীয় পূজা উৎসব। হিন্দুদের উৎসব-যুক্ত যে ক'টি পূজানুষ্ঠান আছে Shivratri তার অন্যতম। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য নিশিজাগরণ এবং রাত্রির চার প্রহরে বিশেষ বিশেষ উপচার এবং মন্ত্রে শিবের আরাধনা এবং একই সঙ্গে রাত জাগার অনুষঙ্গ হিসেবে সারা রাত ধরে নাচ-গান-নাটক ইত্যাদির অনুষ্ঠান।

Shivratri এক রাত্রির অনুষ্ঠান। তবে কোথাও কোথাও Shivratri কে কেন্দ্র করে একাধিক দিনের মেলাও বসে। এর আরেক বৈশিষ্ট হলাে-- ব্রতীরা নিজেরাই চার প্রহরে শিবের ওই পূজা করে থাকেন। আলাদা করে পুরােহিতের প্রয়ােজন প্রায় পড়েই না। Shivratri কিন্তু দু’ভাবে পালন করা হয়। এক, ওই বিশেষ দিনে পূজার্চনার মধ্য  দিয়ে। দুই, ব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে। ব্রত আবার দু'রকম ভাবে পালন করা হয়। Shivratri র দিন উপােস করে পূজা ও ব্রতকথা শুনে পরদিন ব্রাহ্মণ ভােজন ও পারণ ভঙ্গ। দ্বিতীয়টি হলাে বছরভর ব্রত পালন। এক্ষেত্রে কোনও এক শিরাত্রিতে ব্রত রেখে পরবর্তী Shivratri তে তা উদ্যাপন করতে হয়। এক্ষেত্রে ওই এক বছর প্রতিমাসে পূজা, উপবাস ও জাগরণ করতে হয়।


গরুড় পুরাণের মতে, এইভাবে দ্বাদশবার্ষিক ব্রত করলে ব্রতীর স্বর্গবাস হয়। Shivratri র মাহাত্ম সম্পর্কে পুরাণে বিভিন্ন ব্রতকথা আছে। সেইসব ব্রতকথার সার বক্তব্য, যদি দুর্জনেও, নিজের অজ্ঞাতে সারাদিন উপবাসী থেকে রাত্রে  চার প্রহরে শিবের মাথায় জল বেলপাতা  দেয় অথবা শিব মন্দিরের প্রদীপ জালায়। তাহলে সেও অশেষ পুণ্যের অধিকারী হয়। মৃত্যুর পর তার গতি হয় শিবলােকে।

এ সম্পর্কে shiv পুরাণে আছে দুটি কাহিনি। প্রথমটিতে রুরুহ নামে এক ব্যাধ কোনও এক শিবরাত্রির দিন বাবা-মা এবং স্ত্রীর আহারের জন্য শিকারে যায়। সারাদিনে একটিও শিকার এবং কোনও খাবার না পেয়ে ওই ব্যাধ দিনের শেষে এক জলাশয়ের কাছে আপেক্ষা করে। পশুরা রাতে এখানে জলপানের জন্য এলে তাদের হত্যা করবে এই মতলবে। সেখানে ঘাপটি মেরে থাকে ব্যাধ। রাতের প্রথম দিকে আসে এক হরিণী। তাকে মারতে গেলে সে তার বাচ্চাদের কারও কাছে রেখে আসার জন্য একটু সময় চায়। বলে সে ঠিক ফিরে আসবে। হরিণী চলে যায়। অপেক্ষা করতে থাকে। করুহ এমন সময় ওই হরিণীকে খুঁজতে আসে তার বােন। বাধ তাকে মারতে গেলে সেও একই কথা বলে বিদায় নেয়। ব্যাধ জেগে অপেক্ষা করতে থাকে। এরপর আসে সেই হরিণীর স্বামী হৃষ্টপুষ্ট এক হরিণ। তাকে মারতে গেলে সেও একই ভাবে একটু সময় চেয়ে বিদায় নেয়। রাতের চার প্রহরের সময় কথা রাখতে সেই হরিণ এবং দুই হরিণী এসে বাধকে বলে, ‘এবার আমাদের হত্যা করাে। এদিকে তাদের বাচ্চারাও এসে একই কথা বলে। যদি বাবা মা-ই না থাকে তাহলে বেঁচে লাভ কী? তুমি। আমাদেরও হত্যা করাে।

ব্যাধ যে গাছে ঘাপটি মেরে ছিল সেটি একটা বেল গাছ আর নীচে ছিল একটি শিবলিঙ্গ। প্রতিবারই হরিণদের মারার জন্য ধনুক-বাণ ঠিক করার সময় নড়া চড়ায় বেলপাতা এবং একটু করে শিশিরের জল পড়ে গাছের তলায় শিবের মাথায়। তাতেই তার উপােস করে চার  প্রহরের পুজো হয়ে যায়। তাতেই হয় তার পরম জ্ঞান। সে আর হরিণদের মারে না। shiv এবার দর্শন দিয়ে বলেন, “তােমার পুজোতে খুশি হয়েছি আমি। বর চাও করুহ লুটিয়ে পড়ে শিবের পায়ে বলে, ‘আমি তাে সবই পেলাম।

রুরুহ শিবের বরে পেল রাজার মতাে বৈভব। আর পরজন্মে জন্মাল রামের সখা গুহ হিসেবে। অন্তিমে পেল পরম পদ। দ্বিতীয় কাহিনিতে দুরাচারী বেনিধি Shivratri র রাতে অভুক্ত থেকে শিবের প্রসাদ চুরি করে খাওয়ার জন্য প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং অন্য পুরাণকথায় ব্যাধ সুন্দর একই ভাবে শিবলিঙ্গ স্পর্শ করে মুক্তিলাভ করে। Shivratri র মূলকথা, এটি সর্বজনের মুক্তির এক সহজ সরল। অনুষ্ঠান ও এখানে রয়েছে সকলের সমান অধিকার। ঘটেছে পূজা ও বিনােদনের  মেলবন্ধন।

লিখেছেনঃ নন্দলাল ভট্টাচার্য

Previous
Next Post »