রক্ষাবন্ধন কিভাবে শুরু হয়েছে।

বাঙালিদের রক্ষাবন্ধন


রক্ষাবন্ধন বাঙালিদের কাছে রাখিবন্ধন নামে পরিচিত। রাখি পরানাের সময় বােনেরা ভগবানের কাছে ভাইয়ের মঙ্গলময় জীবন প্রার্থনা করেন এবং সমাজের অশুভ শক্তির থেকে নিজের সম্মান রক্ষা ও বাঁচার অধিকার ভাইয়ের কাছে চেয়ে থাকেন। ভারতীয় পরস্পরার মূল স্তম্ভ হলাে বিশ্বাসের বন্ধন। এই বন্ধন রক্ষা করার একটি বিশেষ মাধ্যম হলাে রাখিবন্ধন। রাখি পরার পর ভাইরা বােনদের অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এই উৎসবটিকে একটি জাতীয় রূপ দিয়েছে। সমাজের সুরক্ষা নির্ভর করে সমাজের পারস্পরিক ঐক্য ও সংগঠনের উপর। একতা ও সংগঠন সম্ভবপর হয় সমাজে মানুষের অকৃত্রিম 'ভালােবাসায়। সঙ্ঘকার্যের আধার হলাে। সমাজের প্রতি অকুণ্ঠ-অকৃত্রিম স্নেহ ভালােবাসা ও ভক্তি ভাব।

রক্ষাবন্ধন কিভাবে শুরু হয়েছে।
রক্ষাবন্ধন কিভাবে শুরু হয়েছে।

রক্ষাবন্ধন কিভাবে শুরু হয়েছে?

একশত যজ্ঞ সম্পূর্ণ করার পর দানবরাজ বলির স্বর্গ জয়ের লালসা জাগ্রত হয়। দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে এই সংবাদ পৌছলে তিনি অত্যন্ত চিন্তায় পড়ে যান। অতঃপর ভগবান বিষ্ণুর কাছে গিয়ে ইন্দ্র দেবলােক ও দেবতাদের নিরাপত্তার আর্জি জানান। ভগবান বিষ্ণু তখন ব্রাহ্মণ বেশে দানবরাজ বলির সম্মুখে উপস্থিত হয়ে ভিক্ষা স্বরূপ “তিন পা’ জমি চেয়ে বসেন। ব্রাহ্মণদেবকে খালি হাতে ফেরানাে অধর্ম হয়, তাই দানবরাজ বলি গুরু শুক্ৰদেবের অমত সত্ত্বেও জমি দানের কথা দেন। শুদেব ব্রাহ্মণদেব রূপী ভগবান বিষ্ণুকে চিনতে পেরে দানবরাজ বলিকে তা জানান। কিন্তু দানবরাজ বলি ব্রাহ্মণদেব রূপী ভগবানবিষ্ণুকে তার ইচ্ছামত ‘তিন পা’ জমি চাইতে বলেন। এরপর বিষ্ণু এক পা পৃথিবীতে, অন্য পা স্বর্গে রােখে তা ফিরিয়ে নেন। তৃতীয় পা রাখার জন্য সমান জমি না মেলায় দানবরাজ  বলি নিজের মাথা পেতে দেন। বলির মাথায় ভগবান বিষ্ণু পা রাখতেই তিনি পাতাল লােকে পৌঁছান। এই ভাবে ভগবান বিষ্ণু ত্রিভুবন (স্বর্গ-মর্ত পাতাল)-কে রক্ষা করেন। ভগবান বিষ্ণুর পাতাল প্রবেশ হবার পর দানবরাজ বলি সেবা ও ভক্তি বন্দনায় বিষ্ণুকে আবদ্ধ করে রাখেন এবং কথা আদায় করে নেন বিষ্ণু যেন তার দ্বার রক্ষী হিসাবে তার সঙ্গেই থাকেন। এই দিকে বিষ্ণুর অভাব বােধ  বৈকুণ্ঠলােকে দেখা দিলে দেবী লক্ষ্মী নারদ মুনীর কাছে জানতে পারেন যে বিষ্ণু পাতাললােকে বলির দ্বাররক্ষী হিসাবে বচনবদ্ধ অবস্থায় আছেন। নিজের দুঃখ আর বৈকুণ্ঠলােকের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অস্থির হয়ে দেবী লক্ষ্মী নারদ মুনীর পরামর্শমতাে পাতাললােকে গিয়ে ভাই বলে সম্বােধন করে দানবরাজ বলিকে রাখি পরান। এই ভ্রাতৃত্ব গ্রহণ করে উপহার স্বরূপ দানবরাজ বলি দেবী লক্ষ্মীর ইচ্ছানুসারে ভগবান বিষ্ণুকে তার হাতে ফিরিয়ে দেন। এই দিনটিতে ছিল শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা।


দ্বাপর যুগে অর্থাৎ মহাভারত যুগেও রাখি বন্ধনের উল্লেখ পাওয়া যায়। শিশুপালকে বধ করার সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আঙুল কেটে যায়। দ্রৌপদী নিজের শাড়ির আঁচলের অংশ ছিড়ে শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে জড়িয়ে বেঁধে দিলে রক্তপাত বন্ধ হয়। আর এই বন্ধনের উপহার হিসেবে শ্রীকৃষ্ণু কুরু রাজসভায় বস্ত্রহরণের সময় দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেন। এই দিনটিও ছিল শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন।


ভারতের পরম্পরাগত ইতিহাসেও রাখি বন্ধনের অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে। যেমন বিশ্ব জয়ের ইচ্ছা নিয়ে আলেকজান্ডার দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার অনেক রাজ্য জয় করে এসে রাজা পুরুর কাছে বাধা পান। রাজা পুরুর ক্ষমতা ও সেনাবল দেখে আলেকজাণ্ডারের স্ত্রী বিচলিত হন। ভারতের সংস্কার সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি রাজা পুরুর হাতে রাখি পরিয়ে আলেকজান্ডারের প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন।


একবার চন্দ্রশেখর আজাদ ইংরেজ সেনার চোখে ধুলাে দিয়ে পালানাের সময় এক বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেই বাড়িতে এক বিধবা মা তার বিবাহযােগ্যা কন্যাকে নিয়ে বসবাস করতেন। তাদের মুখে সংসারের করুণ কাহিনি জানতে পেরে বিধবা মাকে বলেন যে-ইংরেজ সেনার হাতে তাকে ধরে তুলে দিতে। এতে পুরস্কার স্বরূপ তিনি পাঁচ হাজার টাকা পাবেন, আর তা দিয়ে তিনি যেন মেয়ের বিয়ে দেন। একথা শােনার পর বিধবা মা বলেন “তােমাদের মতাে দেশভক্ত সন্তানরা নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করছে। আর তােমাদের জন্যই আমরা সুরক্ষিত এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে। আছি। তাই এ কাজ আমি মরে গেলেও পারবাে না। একথা শেষ করে তিনি চন্দ্রশেখর আজাদের হাতে এক গুচ্ছ সুতাে পরিয়ে দেন। গভীর রাতে চন্দ্রশেখর আজাদ সে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার সময় পাঁচ হাজার টাকা বালিশের নীচে রেখে যান এবং একটি চিরকুটে লিখে যান আমার প্রিয় বােনের জন্য উপহার স্বরূপ এই অর্থ রেখে গেলাম।


ভারত মায়ের বিভাজনের চক্রান্ত করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের আদেশ দেন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসক কার্জন এর বিরুদ্ধে সারা দেশে বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ঠিক এই সময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশের মানুষদের ভ্রাতৃত্ববােধে উদ্বুদ্ধ করে এক মানবিক বন্ধনে। আবদ্ধ হবার ডাক দেন। তিনি তখন রাখির মাহাত্ম্যকে উপলব্ধি করে ১৬ অক্টোবর রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেন।


Previous
Next Post »