রামগড়ের বিস্মৃত রানি অবন্তী বাঈ।

রামগড়ের বিস্মৃত রানি অবন্তী বাঈ।

নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিকে বলেছিলেন আত্মবিস্মৃত জাতি। নিজের ইতিহাস সম্বন্ধে বাঙালির অনুসন্ধিৎসা নেই। আয়ুষ্কাল নামক একটি নির্দিষ্ট কালখণ্ডের মধ্যে বাঙালি বেঁচে থাকে, তারপর টুপ করে একদিন মরে যায়। কথাটা যে বহুলাংশে সত্য সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলাে, একথা কি শুধু বাঙালির ক্ষেত্রেই খাটে ? ইতিহাস বিমুখতা সম্ভবত সমগ্র ভারতবর্ষের অসুখ।

রামগড়ের বিস্মৃত রানি অবন্তীবাই।
রামগড়ের বিস্মৃত রানি অবন্তীবাই।

যেসব মহিলা ভারতের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের অন্যতম রামগড়ের রানি অবন্তীবাই। তাঁর সাহস এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব তাঁকে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, ওয়ারাঙ্গালের রানি রুদ্রাক্ষ্মা দেবী এবং উল্লালের রানি আবাক্কা চোঁটার সঙ্গে একই উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু ১৮৫৭ সালের মহাসংগ্রামে রানি অবন্তীবাইয়ের বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা নিয়ে কতটুকু লেখালেখি হয়েছে? কতজন গবেষক তুলে ধরেছেন এই অসমসাহসী মহিলার কাহিনি ?

রানি অবন্তীবাইয়ের জন্ম ১৮৩১ সালে। বিয়ে হলাে অধুনা মধ্যপ্রদেশের মান্ডলা জেলার অন্তর্গত রামগড়ের রাজা বিক্রমাদিত্য লােধির সঙ্গে। ছেলেবেলা থেকেই অবন্তী স্বাধীনচেতা। পিতৃগৃহে থাকার সময়েই অসিচালনা, ধনুর্বিদ্যা, অশ্বারােহণ সামরিক কৌশল রচনা ইত্যাদিতে শিক্ষা পেয়েছিলেন। বিয়ের পর সেই শিক্ষা আরও পরিশীলিত হয়েছিল।

 যুদ্ধবিগ্রহেরানি এতটাই দক্ষ ছিলেন যে বিক্রমাদিত্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর রামগড়ের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিতে তাঁর কোনও অসুবিধেই হয়নি। এমনকী রাজার মৃত্যুর পরও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তার অভাব বিন্দুমাত্র অনুভূত হয়নি। কিন্তু ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল অন্য জায়গায়। তৎকালীন ভারতের শাসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবন্তীবাইকে রাজা বিক্রমাদিত্যের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে মানেনি। ১৮৪৮ সালেই বড়লাট ডালহৌসি স্বত্ববিলােপ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। প্রণীত হয়েছিল প্রয়ােজনীয় আইন। সেই আইনের জোরে ইংরেজ সরকার যেসব দেশীয় রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা যেতেন তাদের রাজ্য কেড়ে নিত।


১৮৫১ সালে ইংরেজ সরকার রামগড় রাজ্যকে ‘অভিভাবকহীন ঘােষণা করল। রানি অবন্তীবাইয়ের জায়গায় সরকার মনােনীত একজন আধিকারিক অভিভাবক নিযুক্ত হলেন। ক্ষুব্ধ অপমানিত রানি সেই ব্রিটিশ অফিসারকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করলেন।
রানির পরের পদক্ষেপটি নিঃসন্দেহে আধুনিক যুগের যে কোনও মেজর জেনারেলকেও অবাক করে দেবে। তিনি প্রতিবেশী দেশীয় রাজ্যগুলিতে দূত পাঠিয়ে সেখানকার রাজাদের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে যােগ দেওয়ার অনুরােধ জানালেন। রাজাদের দেওয়া চিঠিতে রানি লিখেছিলেন, “যদি মনে করেন পরাধীন মাতৃভূমির প্রতি আপনাদেরও কিছু কর্তব্য আছে তাহলে খােলা তলােয়ার নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। নয়তাে মেয়েদের মতাে হাতে চুড়ি পরে বসে থাকুন ঘরের কোণে।

তাঁর অনুরােধে কাজ হয়েছিল তৎকালীন সেন্ট্রাল প্রভিন্সের প্রতিটি রাজা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন রানির নেতৃত্বে। রানি ৪০০০ সেনা নিয়ে নিজস্ব বাহিনী গঠন করলেন। পরে রানি এবং সেন্ট্রাল প্রভিন্সের দেশীয় রাজ্যগুলির সম্মিলিত সেনাবাহিনী ১৮৫৭-র মহাসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল।

খেরি নামের এক গ্রামে রানি প্রথম ব্রিটিশ বাহিনীর মুখােমুখি হলেন। ভারতীয় সেনার পরাক্রমে পিছু হটতে বাধ্য হলাে ব্রিটিশ সেনা। জীবনের প্রথম যুদ্ধেই বড় জয় পেয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলেন রানি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ আবার রামগড় আক্রমণ করল। রানির শক্তিকে খাটো করে দেখার ভুল এবার আর তারা করেনি। পূর্ণশক্তির ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে বেশিক্ষণ যােঝা সম্ভব হয়নি রানির পক্ষে। যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে তিনি বাধ্য হন।

কিন্তু লড়াই ছাড়েননি। সম্মুখ যুদ্ধে ব্রিটিশের মােকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই তিনি গেরিলাযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। আক্রমণ করলেন ব্রিটিশ জেনারেল ওয়াডিংটনের শিবির। কিন্তু ভাগ্য মন্দ এবারও তাকে হার মানতে হলাে। পরাজয় নিশ্চিত হবার পর সম্ভবত জীবনে ওই একবারই তিনি ভয় পেয়েছিলেন। ব্রিটিশের হাতে বন্দি হবার ভয়। অতঃপর আর কী! কোষ থেকে তলােয়ার বের করে নিজের বুকে বসিয়ে দিলেন। ব্রিটিশের দেওয়া শাস্তি ভােগ করার থেকে ওই পরিণতি তার কাছে অনেক সম্মানের।

ভারতের ইতিহাসে অবম্ভীবাইয়ের স্থান হয়নি। যদি হতাে তাহলে ভারতের ইতিহাস আর সমৃদ্ধ হতাে। ভারতের নতুন প্রজন্মও অনুভব করত ভারতীয় জাতিসত্তার হৃৎস্পন্দন।

Previous
Next Post »