ত্রিপুরার পৌরাণিক ইতিহাস। Tripura's mythological history

ত্রিপুরার পৌরাণিক ইতিহাস।

ত্রিপুরা একটি ছােট্ট রাজ্য হলেও এর ইতিহাস সুপ্রাচীন। পৌরাণিক যুগে ত্রিপুরার নাম ছিল কিরাতদেশ। মহাভারতের যুগে এই কিরাতদেশ ছিল সমুদ্রোপকূলবর্তী। বিষ্ণুপুরাণ, মার্কন্ডেয় পুরাণ ও মহাভারতের সভাপর্বে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলকে কিরাতদেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।শক্তিসঙ্গমতন্ত্র ও রাজ রাজেশ্বরীতন্ত্রও উপরিউক্ত মতেরই সমর্থন করেছে।

ত্রিপুরার রাজবংশের ঐতিহাসিক গ্রন্থ সংস্কৃত ‘রাজরত্নাকরম’ ও সংস্কৃত ও বাংলা ‘রাজমালা’ যা চোদ্দশাে শতকে রচিত, সেখানেও বর্তমান ত্রিপুরা অঞ্চলকে কিরাতদেশ হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। বিষ্ণুপুরাণ থেকে জানা যায় যে তিতিক্ষুর পুত্র বালী এবং বালীর পাঁচ পুত্র হলাে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, ক্ষুণ্য ও পৌন্ড্র এবং এদের থেকে পাঁচটি স্বতন্ত্র রাজ্যের নামকরণ হয়। ত্রিপুরা ক্ষুণ্যের নামাঙ্কিত প্রদেশে বর্তমান। ত্রিপুরা রাজবংশ হলাে চন্দ্রবংশতাংশ সদ্ভূত। চন্দ্রবংশের যষ্ঠতম রাজা ছিলেন যযাতি। প্রতিষ্ঠানপুর ছিল যযাতির রাজধানী যা বর্তমান প্রয়াগ বা এলাহাবাদ শহর।

ত্রিপুরার পৌরাণিক ইতিহাস।
ত্রিপুরার পৌরাণিক ইতিহাস।

মহাভারত অনুযায়ী যযাতি দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর পাণিগ্রহণ করেছিলেন এবং মহারানির দাসীরূপে দৈত্যরাজ বৃষ পর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠাকে রাজপ্রাসাদে আনয়ন করেন। দেবানীর গর্ভে দুই পুত্র  যদু ও তুর্বসুর জন্ম হয়। শর্মিষ্ঠার গর্ভে তিন পুত্র যথাক্রমে  হ্য, অনু ও পুরুর জন্ম হয়। অবৈধভাবে শর্মিষ্ঠার পরম্পরা গর্ভে পুত্রের জন্ম হওয়ায় শুক্রাচার্য যযাতিকে জরাগ্রস্ত হবার অভিশাপ দেন। তখন যযাতি সকল পুত্রকে ডেকে তার জরাব্যাধি গ্রহণ করতে অনুরােধ করলে একমাত্র পুরু ব্যতীত সকলেই অসম্মতি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে পুরু ছাড়া সব পুত্রকেই রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন যযাতি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ গড়ার জন্য তখন যযাতি নন্দনেরা ছড়িয়ে পড়েন।

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ অনুসারে দ্রুহ্যকে প্রতিষ্ঠানপুর থেকে দক্ষিণ পূর্বদিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন যাতি। পূৰ্বাভিমুখে যাত্রা করে হ্য যখন সাগরসঙ্গমে উপস্থিত তখন তিনি সাংখ্য দর্শন প্রণেতা কপিলমুনির সাক্ষাৎ প্রাপ্ত হন। কপিলমুনির নির্দেশে হ্য সাগরদ্বীপে(সুন্দরবন অঞ্চলে) ত্রিকো নগরী স্থাপন করেন। রাজমালার বংশপঞ্জী অনুসারে চন্দ্রের অধস্তন বত্রিশতম রাজা প্রতর্দন কিরাত দেশ জয় করেন এবং অসমের নওগাঁও অঞ্চলে অবস্থিত কপিলি নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গমস্থলে প্রাচীন ত্রিবেগ রাজ্যের যা দ্বিতীয় ত্রিকো নামেও খ্যাত তার প্রতিষ্ঠা করেন।


গ্রিক পর্যটক টলেমি কিরাতদেশের যে কর্ণনা করেছেন তা ব্রহ্মপুত্র নদের মুখ থেকে বর্তমান ত্রিপুরা হয়ে আরাকান নদীর মুখে বঙ্গোপসাগরের পূর্বপাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিবরণে রাজমালার লিপিবদ্ধ ইতিহাসের সত্যতা প্রমাণিত হয়। ত্রিপুরা নামের উৎস নিয়ে পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন অনেক মত
প্রচলিত আছে। ত্রিপুর তথা দ্রুহ্য বংশের | চুয়াল্লিশতম রাজা দৈত্য ও চেদীশ্বর দুহিতা মাণ্ডবীর পুত্র ছিলেন ত্রিপুর। অনেকের মতে  ত্রিপুর থেকেই ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি। কিন্তু এই মতবাদ রাজবংশের সংস্কৃত গ্রন্থ ‘রাজরত্নাকরম নস্যাৎ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যে জন্মহতু রাজপুত্রের নাম ত্রিপুর রাখা হয়েছে। এই ত্রিপুর ছিলেন অত্যন্ত অনাচারী ও ধর্মদ্বেষী রাজা। যখন ত্রিপুরের অত্যাচারে রাজ্যের প্রজাসকল অতিষ্ঠ হয়ে উঠল তখন সকলে ত্রিপুরের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য মহাদেবের আরাধনা করতে লাগলেন। মহাদেব প্রজাদের তপস্যায় সন্তুষ্ট হলেন এবং ত্রিপুরাকে বধ করলেন। অনেকের মতে পীঠদেবী ত্রিপুরাসুন্দরী নামানুসারে ত্রিপুরা নামটি প্রচলিত হয়েছে।

মহারাজ প্রতদনের পৌত্র কলিন্দ প্রাচীন ত্রিবেগ অর্থাৎ সুন্দরবন অঞ্চলে দেবী ত্রিপুরা সুন্দরীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভাগীরথীর তীরে ছত্রভাগ নামক গ্রামের এক মন্দিরে বিগ্রহের পূজা হাতে। অনেকে মনে করেন সতীর বক্ষস্থল এখানে পতিত হয়েছিল। এই তীর্থস্থানের কথা কবিকঙ্কন চণ্ডী ও চৈতন্য ভাগবতে উল্লেখ আছে। কৈলাশ চন্দ্র সিংহের মতে ত্রিপুরী ভাষার জলবাচক শব্দ ‘তেীয় এবং জলের নিকট অর্থে ‘প্রা’ শব্দের যােগে তেীয় প্রা সৃষ্টি হয়েছে এবং তেীয় থেকেই ত্রিপুরা শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই তত্ত্বটি অনুপযুক্ত কারণ ‘প্রা নিকট নয়, ভাগ হয়ে যাওয়া। অনেকের মতে ‘ত্রিপুরাতন্ত্র থেকে ত্রিপুরা শব্দটির উৎপত্তি। শাক্ত, বৈষ্ণব ও শৈব এই তিন তন্ত্রের সমন্বিত সাধনার প্রণালীই হলাে ত্রিপুরতন্ত্র। পরশুরাম কল্পসূত্র থেকে ত্রি পুরাতন্ত্র সম্পর্কে জানা যায়। তান্ত্রিক আচার অভিচার আবহমানকাল থেকেই ত্রিপুরী জাতির ধর্মাচরণে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। ত্রিপুরাতন্ত্রের প্রভাবের ফলে এই রাজ্যে শৈব শক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছিল। মহাভারতের সভাপর্ব, বনপর্বও ভীষ্মপর্বে ত্রিপুরার স্পষ্ট উল্লেখ আছে।


কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে প্রাগজ্যোতিষের রাজা ভাদাত্তের অধীনেদীনা কিরাত মেকল অর্থাৎ মণিপুরের সঙ্গে ত্রিপুরার নাম নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কর্ণের দিগ্বিজয়ে পূর্বাভিমুখে রাজ্যগুলির মধ্যে ত্রিপুরা নাম আছে। এর থেকেই প্রমাণিত যে ত্রিপুরা কত প্রাচীন। রাজা ত্রিপুরের পুত্র ত্রিলােচন পৌরাণিক যুগে ত্রিপুরা রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বলে বিবেচিত। মহারাজ যুধিষ্ঠির তাঁর সুখ্যাতি শুনে ত্রিলােচনকে ইন্দ্রপ্রহে আপায়িত করেছিলেন এবং উপহার হিসেবে হস্তী দত্ত নির্মিত একটি সিংহাসন এবং শ্বেতছত্র প্রদান করেন। লােকবিশ্বাস সেই সিংহাসনই ত্রিপুর সিংহাসন যা এখনও উজ্জয়ন্ত প্রাসাদে সংরক্ষিত। ত্রিলােচন ত্রিপুরা রাজবংশের কুলদেবতা চতুর্দশ দেবতা পূজার প্রবর্তক। স্বয়ং মহাদেব ত্রিলোচনকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন যে আষাঢ় মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে তিনি পুজা গ্রহণ করা, ত স্বয়ং অবতীর্ণ হবেন। চতুর্দশ দেবতারা হলেন-- হর, উমা, হরি, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, ব্রহ্মা, পৃথিবী, সমুদ্র, গঙ্গা, অগ্নি, কামদেব ও হিমাদ্রি।

শিবের কথায় সকল দেবতা পূজা গ্রহণের জন্য উপস্থিত তখন একমাত্র হরি বা নারায়ণ আসেননি। দণ্ডীদের বিবেচনায় ত্রিলােচন ক্ষীরােদ সাগরের তীরে বীণাবাদন শুরু করলেন হরিকে তুষ্ট করতে। হরি তুষ্ট হয়ে চতুর্দশ দেবতা পূজা গ্রহণে সম্মত হলেন। ত্রিপুরার উত্তরে কৈলাসহর অঞ্চলে বিখ্যাত শৈবতীর্থ হলাে উনকোটি অর্থাৎ এক কোটির চেয়ে এক কম। অনেকে ঊনকোটিকে পূর্বের বারাণসীও বলেন।

রাজ্যের উপজাতিরা একে বলে ‘সুব্রায় দু' অর্থাৎ শিবের বাসস্থান। অনেকে একে কপিল তীর্থও বলে থাকে, কারণ পুরাকালে কপিলমুনি এখানে সাধনা করেছিলেন। এই তীর্থের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মনু নদী। পুরাকালে মনু ঋষি মনু নদীর তীরে ধ্যান করেছিলেন। লােকবিশ্বাস মনুর নামেই মনু নদী হয়েছে। বায়ুপুরাণে মনু নদীর নাম উল্লেখ আছে এবং মনু ও বরবক্ৰ (বরাক) নদীর মধ্যাঞ্চলকে অত্যন্ত পবিত্র বলা হয়।

পণ্ডিত শীতলচন্দ্র চক্রবর্তীর মতে প্রাচীনকালে ত্রিপুরার পর্বতের নাম ছিল রঘুনন্দন পর্বত। দুটি প্রাচীন নদী ত্রিপুরায় বহমান --- মনু ও গােমতী। সুতরাং সূর্যবংশীয়দের সঙ্গে ত্রিপুরার একটা সংযােগ থাকলেও থাকতে পারে। কারণ তিনটি নামই সূর্যবংশীয় দিগের সঙ্গে সুপরিচিত। পীঠমালাতন্ত্র ও তন্ত্রচূড়ামণি ত্রিপুরার উল্লেখ করেছে সুস্পষ্টভাবে। গুহ্যতন্ত্রে ও কমঘগ তন্ত্রে ত্রিপুরার উপস্থিতি বিদ্যমান। মহাঋষি বেদব্যাস ভবিষ্য পুরাণে ত্রিপুরার ভৌগােলিক অবস্থান বর্ণনা করেছেন এইভাবে--
বরেন্দ্র তাম্রলিপ্তঞ্চ হেড় স্বম মণিপুরক। "লৌহিত্য স্ত্রৈ পুরং চৈব জয়ন্তাখ্যং  সুসঙ্গকম।।”
পূর্বভারতের পৌরাণিক যুগের রাজ্যগুলির মধ্যে ত্রিপুরার উপস্থিতি সমুজ্জ্বল। সুতরাং একথা বলা অত্যুক্তি হবে যে, ত্রিপুরা ভারতের পৌরাণিক যুগের অন্যতম নিদর্শন ও সনাতন সভ্যতার ধারক ও বাহক।

লিখেছেনঃ সৌরিশ দেববর্মন

Previous
Next Post »