বিশ্বকর্মা বেদের বিশ্বস্রষ্টা আজ শুধুই যন্ত্রের দেবতা।

বিশ্বকর্মা বেদের বিশ্বস্রষ্টা আজ শুধুই যন্ত্রের দেবতা।

বিশ্বকর্মা নামের মধ্যেই তার দেবত্ব, কর্ম এবং মহিমার উদ্ভাস। সাধারণভাবে শিল্প, প্রযুক্তি, নির্মাণ কর্মের রূপকার তিনি। তার সৃষ্টিসম্ভারে ত্রিলােক সমুজ্জ্বল। এই মহাবিশ্বের সব কিছুর তিনিই স্রষ্টা এমন কথাও বলা হয়ে থাকে। বেদ থেকে শুরু করে পুরাণ ইত্যাদিতে বিশ্বকর্মার নানা কর্মের যে ইতিহাস বিধৃত তাতে তাকে মহাস্রষ্টা বলে স্বীকার করতেই হয়।

বেদে তিনি বিশ্বস্রষ্টা জগৎপতি। উপনিষদে তিনিই আবার পরব্রহ্ম। সবকিছুর মূল। পুরাণে তার প্রকাশ দেবশিল্পী রূপে। এখানেও স্রষ্টা তিনি; কিন্তু ক্ষেত্র হলাে কিছুটা সীমাবদ্ধ। আর তারই পথ ধরে বিশ্বকর্মা মহাসন্ত্ৰী। শুধুই যন্ত্রের দেবতা।

বেদের বিশ্বস্রষ্টা আজ শুধুই যন্ত্রের দেবতা।
বেদের বিশ্বস্রষ্টা আজ শুধুই যন্ত্রের দেবতা।

বেদে তিনি সর্বশক্তির উৎস। তিনি জগৎসৃষ্টিকারী এই জগতের প্রতিপালক, আবার জগৎ বিনাশকও। তার এই ত্রিরূপ থেকেই তিনি স্রষ্টা হিসেবে ব্রহ্মা, পালনকর্তা হিসেবে বিষ্ণু এবং ধ্বংসকারী হিসেবে মহাকাল মহাদেবকে সৃষ্টি করেন। এমন কথাই বলে থাকেন অনেকে। বিশ্বকর্মার রূপ কল্পনাতেও দেখা যায় বৈচিত্র্য।

বঙ্গদেশে হাতির ওপর অধিষ্ঠিত তার মূর্তি। সে মূর্তি যেন ময়ূর ছাড়া কার্তিক। সুপুরুষ রাজোচিত গঠন। চার হাতে হাতুড়ি, কুঠার, তির-ধনুক এবং তুলাদণ্ড। অন্যদিকে, উত্তরভারত বা পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের বিশ্বকর্মা মূর্তিরও চারটি হাত। কিন্তু সেই চার হাতে থাকে উপবীত, কমণ্ডলু, বেদ ও লেখনি। আর মুখভরা সাদা গোঁফদাড়ি এবং মাথায় রাজমুকুট। এইসব অঞ্চলে বিশ্বকর্মা উচ্চাসনে অবস্থিত। পাশে রয়েছে হাঁস।

বেদের যুগে বিশ্বকর্মা ছিলেন মুখ্যদেবতা। সমস্ত শক্তির আধার। সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। অথচ পরবর্তীকালে তিনিই পরিণত হন প্রায় অকিঞ্চিৎকর দেবতায়। তার এই বিবর্তন কিছুটা বিস্ময়কর। বঙ্গদেশে বিশ্বকর্মা কোনাে এক সম্প্রদায়ের দেবতা নন। জাতি-বর্ণ নিবিশেষে কলকারখানা, শিল্পসংস্থা বা যেখানেই যন্ত্রের ব্যবহার সেখানেই পূজা হয় তার। কিন্তু উত্তর বা পশ্চিম ভারতে তিনি লােহার সম্প্রদায়ের। একবারে নিজস্ব দেবতা রূপেই পূজিত হন। বিশ্বকর্মা তাদের যুগদেবতা বলে লােহারারা তাদের পদবি হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই বিশ্বকর্মা শব্দটিকেই।

বঙ্গদেশে বিশ্বকর্মার পূজা বছরে শুধু একদিন  ভাদ্র- সংক্রান্তিতে। এখানে  বিশ্বকর্মার কোনাে মন্দিরের কথাও জানা যায় না। কিন্তু উত্তর, পশ্চিম বা দক্ষিণ ভারতের র বহু জায়গাতেই রয়েছে বিশ্বকর্মার বিশাল  বিশাল মন্দির। সেইসব মন্দিরে বিশ্বকর্মার মূর্তি টা ব্রহ্মার মতাে একথা আগেই বলা হয়েছে।

Biswakarma Puja - Importance of it in Bengal - Odisha - Assam - Jharkhand and Date in 2018

মা ইলােরায় সপ্তম শতকের একটি গুহা রয়েছে। বৌদ্ধ আমলের ওই দশ সংখ্যক গুহাটি সাধারণভাবে বিশ্বকর্মা গুহা নামেই পরিচিত। এখানে পূজিত হন বুদ্ধদেব। কিন্তু গুহাটি সম্ভবত তার চিত্রশিল্প সম্ভারের জন্য বিশ্বকর্মা গুহা নামে চিহ্নিত। এর থেকে বােঝা যায়, সপ্তম শতকেও বিশ্বকর্মা স্বমহিমাতেই বিরাজিত ছিলেন। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য ইলােরার এই গুহাটি ‘সুতার কী ঝুল্পি' নামে পরিচিত। বেদে বলা হয়েছে, বিশ্বকর্মা হলেন স্বয়ম্ভ। যখন কোনাে কিছু ছিল না, চারিদিকে ছিল শুধু অন্ধকার আর জল। সেসময় বিশ্বকর্মাই জগৎ সৃষ্টি করে তার মাথার চাদোয়ার আকারে আকাশকে ব্যাপ্ত করেন। সে সময় তিনি নিজেই নিজের থেকে সৃষ্টি করেন দেবতা ও জীব জগৎ। তার রূপ বর্ণনায় ঋগবেদের (১০৮২।২) মন্ত্র বিশ্বকর্মা বিমলা অদ্বিহায়া ধাতা বিধাতা পবসােত সক’– যিনি বিশ্বকর্মা, বৃহৎ তার  মন, তিনি নিজেও বৃহৎ। তিনি নির্মাণ করেন, ধারণ করেন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি সব কিছুই দেখেন। পণ্ডিতরা মনে করেন, সপ্তঋষি লােকের পরবর্তী যে স্থান, সেখানেই তার অবস্থান।

প্রথম স্তরে বিশ্বকর্মাই আদিস্রষ্টা। তিনি অজর, অমর। তার কোনাে স্রষ্টা নেই। নেই আবির্ভাবের কোনাে কথা। কিন্তু যখনই তিনি হলেন পুরাণের দেবতা, তখনই এলাে তার জন্মের কথা পুরাণ মতেই জন্ম হলাে তার বৃহস্পতির বােন মহানাগিনী পরিব্রাজিকা বরস্ত্রীর গর্ভে।। বাবা তার প্রভাস নামে এক বসু বিশ্বকর্মার এই জন্মকাহিনি আছে বিষ্ণুপুরাণে। সেখানে বলা হয়েছে বরস্ত্রী প্রভাসের পুত্র বিশ্বকর্মা হলেন সহস্র শিল্পের কর্তা। তিনি দেবতাদের সূত্রধর। সমস্ত ভুবনের নির্মাতা, শ্রেষ্ঠশিল্পী। তার থেকেই উৎপন্ন হয়েছেন প্রজাপতি।

বিষ্ণুপুরাণ এবং গড়ুর পুরাণ মতে বিশ্বকর্মার চার ছেলে। তারা হলেন—অজৈকপাদ, অহিব্র, ত্বষ্টা ও রুদ্র। কিন্তু স্কন্দপুত্র হলেন মনু, ময়, ত্বষ্টা, শিল্পী এবং দেবল। দুটি তালিকাতেই পাওয়া যায় ত্বষ্টার নাম। ফলে এই দুটি পুরাণে উল্লেখিত নাম অনুযায়ী বিশ্বকর্মার পুত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় আট। এর বাইরেও বিভিন্ন পুরাণ এবং মহাকাব্যে বিশ্বকর্মার পুত্র হিসেবে নাম পাওয়া যায় বানর নলের। এই আটটি ছেলে ছাড়া বিশ্বকর্মার ছিল চারটি মেয়ে। এদের নাম সংজ্ঞা, চিত্রাঙ্গদা, সুরূপা এবং বহিষ্মতী। এঁদের মধ্যে সংজ্ঞা হলেন সূর্যের স্ত্রী।

পুরাণে ত্বষ্টা হলেন বিশ্বকর্মার ছেলে। কিন্তু বেদে যে ত্বষ্টার উল্লেখ রয়েছে তাকেই অনেকে বিশ্বকর্মা বলে অভিহিত করতে চান। বিশ্বকর্মার মতােই ত্বষ্টারও ছিল একই ধরনের গুণ। কিন্তু যে কারণেই হােক, পরবর্তীকালে ত্বষ্টার সবগুণই আরােপিত হয় বিশ্বকর্মায় এবং ত্বষ্টা হয়ে যান তারই পুত্র।

বিভিন্ন পুরাণ ও শাস্ত্রগ্রন্থে বিশ্বকর্মার পাঁচটি স্বরূপের কথা বলা। হয়েছে।

(১) সৃষ্টিকর্তা রূপে তিনি বিরাট বিশ্বকর্মা।
(২) শিল্পাচার্য রূপে তিনি বিধাতা প্রভাসপুত্র ধর্মবংশী বিশ্বকর্মা।
(৩) বসুপুত্র রূপে তিনি অঙ্গিরাবংশী বিশ্বকর্মা।
(৪) শিল্পগুরু হিসেবে সুধৰা বিশ্বকর্মা।
(৫) শুক্রাচার্যের নাতি ও শিল্পগুরু হিসেবে ভৃগুবংশী বিশ্বকর্মা।

সাধারণ ভাবে বিশ্বকর্মার একটিই মাথা। কিন্তু স্কন্দপুরাণ মতে  বিশ্বকর্মার পাঁচটিমাথা। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ ঋষিমন্ত্রে এগুলির উদ্ভব। এদের নাম মনু, ময়, ত্বষ্টা, শিল্পী ও দেবতা। এই পাঁচটি আবার
বিশ্বকর্মার ছেলেদেরও নাম।

বিশ্বকর্মা সমস্ত সৃষ্টির জনক। প্রাণীর উদ্ভব ঘটতে তিনিই সৃষ্টি করেন  পঞ্চ-প্রজাপতির। এরা হলেন, সদ্যোজাত, বামদেব, অঘাের, তৎপুরুষ এবং ঈশান।

বিশ্বকর্মা সত্যযুগে সৃষ্টি করেন স্বর্গ, ত্রেতাযুগে তিনি গড়েছিলেন স্বর্ণলঙ্কা আর দ্বাপরে দ্বারকাপুরী। এরই সঙ্গে তিনি গড়েছিলেন ইন্দ্রপুরী, যমপুরী, বরুণপুরী, কুবেরপুরী, পাণ্ডবপুরী, সুদামাপুরী ইত্যাদি। তিনিই সূত্রধর হিসেবে দেবতাদের জন্য তৈরি করেছিলেন নানা আভরণ ও অস্ত্র। দধীচির অস্থি নিয়ে তিনিই ইন্দ্রর জন্য নির্মাণ করেন বজ্র। ব্রহ্মার কথায় তিনিই নির্মাণ করেন কিস্কিন্ধ্যা। স্বর্ণলঙ্কার স্রষ্টা বিশ্বকর্মা প্রথমে এটি তৈরি করেছিলেন শিবপার্বতীর জন্য। পার্বতীকে বিয়ে করার পর শিব তাদের জন্য একটি অপূর্ব পুরী তৈরি করতে বলেন বিশ্বকর্মাকে। নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্বকর্মা তৈরি করেন এক কনকধাম। গৃহ প্রবেশের জন্য পুরােহিত হিসেবে আহ্বান করা হয় কুবের ও রাবণের পিতামহ পুলস্ত্য ঋষিকে। ওই কাঞ্চনপুরী দেখে তাে ঋষি মােহাবিষ্ট। তাই অনুষ্ঠান শেষ শিবেরই আহ্বানে পুলস্ত্য দক্ষিণা হিসেবে চান ওই কনকপুরীই।

নিজের কথা রাখতে শিব সঙ্গে সঙ্গে তা দেন পুলস্ত্যকে। পুলকিত ঋষি সেটি দেন তার বড়াে নাতি কুবেরকে। ভীষ্মকে বিশ্বকর্মার তৈরি গগনবিহারী পুষ্পক রথটিও দেন তারা। কিন্তু এতে ক্রুদ্ধ হন রাবণ। আপন বাহুবলে জ্যেষ্ঠ কুবেরকে পরাজিত করে, স্বর্ণলঙ্কা এবং পুষ্পক রথ দুয়েরই অধিকারী হন।ত্রিলােক সুন্দরী তিলােত্তমা তারও স্রষ্টা বিশ্বকর্মা। ত্রিপুরাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের সময় শিবকে একটি রথ তৈরি করে দেন বিশ্বকর্মাই। বড়াে মেয়ে সংজ্ঞা তার স্বামী সূর্যের তেজ সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যায়। তখনও মুশকিল আসান করেন বিশ্বকর্মাই। ভ্রমি যন্ত্রে বসিয়ে কমিয়ে দেন সূর্যের তেজ। বড়াে মেয়ের জন্য এসব করলেও আরেক মেয়ে চিত্রাঙ্গদা রাজা সুরথকে বিয়ে করতে চাইলে ক্ষিপ্ত হন বিশ্বকর্মা। রেগে মেয়েকে অভিশাপ দেন, কোনােদিন বিয়ে হবে না তার। বিশ্বকর্মার ব্যবহারে ক্রুদ্ধ যক্ষ গুহ্যক পাল্টা অভিশাপ দেন বিশ্বকর্মা অচিরেই বাঁদর হয়ে বিচরণ করবেন বলে।

অনেক কান্নাকাটির পর মেলে শাপমুক্তির উপায়। তাঁর ও ঘৃতাচীর একটি বানরপুত্র জন্মালে বিশ্বকর্মা পূর্বরূপ পাবেন। তাঁদের সেই পুত্রই হলাে নল। রামায়ণে সেতু বন্ধনের প্রযুক্তিবিদ। বিশ্বকর্মাই তৈরি করেন পুরীর জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মূর্তি।রচনা করেন স্থাপত্যবেদ নামে একটি উপবেদ।

বেদে সৃষ্টিশক্তির রূপকনাম বিশ্বকর্মা। ধাতা, বিশ্বদ্রষ্টা, প্রজাপতি, সর্বজ্ঞ, পিতা, বাচস্পতি, মনােজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা তারই নাম। যজুর্বেদে তিনি প্রজাপতি, অথর্ববেদে পশুপতি আর শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে তিনিই রুদ্র শিব।।

দেবতাদের নামকরণ করেন বিশ্বকর্মা, আর সর্বমেধ নামে এক যজ্ঞ করে বলি দেন নিজেকে নিজেরই কাছে। এসব কারণেই মর্ত্যজীবের কাছে অনধিগম্য তিনি।

বিশ্বকর্মার বিশ্বব্যাপী রূপ আজ সীমাবদ্ধ এক যন্ত্রের দেবতায়। বছরে একবারই শুধু তার পূজা হয় এই বঙ্গদেশে।

লিখেছেনঃ নন্দলাল ভট্টাচার্য।

Previous
Next Post »