গুরুপূর্ণিমা ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন পরম্পরা। Guru Purnima

গুরুপূর্ণিমা ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন পরম্পরা। Guru Purnima 


Sanatan Hindu সংস্কৃতি তথা ভারতীয় সংস্কৃতি যে চারটি স্তম্ভের উপর দাড়িয়ে আছে সেগুলাে হলাে অবতারতত্ত্ব, জন্মান্তরতত্ত্ব, কর্মকে বিশ্বাস ও গুরু পরম্পরা। এই গুরু  পরম্পরা একটি বলিষ্ঠ সংস্কৃতি যা হিন্দু সমাজকে যুগ যুগ ধরে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। গুরুশিষ্যের এই পরম্পরা। হিন্দুধর্মের একটি সারতত্ত্ব। উপযুক্ত গুরুলাভ হিন্দুধর্মের প্রাথমিক সােপান।

গুরব্রহ্মা গুরুবিষ্ণুঃ গুরুর্দেবাে মহেশ্বরঃ।
গুরুত্সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈশ্রীগুরবে নমঃ।।

অর্থাৎ গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু এবং গুরই মহেশ্বর। সাক্ষাৎ পরমব্রহ্মরূপী গুরুকে প্রণাম। এই শ্লেকি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ঈশ্বরের চাইতেও গুরুকে উচ্চস্থান প্রদান করা হয়েছে। বাস্তবে শুরু দিব্য জ্ঞান প্রদান করে দিব্যচক্ষু উন্মােচিত করেন। এইভাবে আমাদের দ্বিতীয় জন্ম হয়। এই জন্য গুরু ব্রহ্মস্বরুপ। গুরু সারা জীবন আমাদের লালন পালন করেন। কণ্টকাকীর্ণ পথে শুরু আমাদের পথ প্রদর্শন করেন। এই জন্য গুরু বিষ্ণুঃ ভগবান স্বরূপ। গুরু আমাদের অসৎ চিন্তা এবং দৃণ নাশ করেন। এই জন্য গুরু শঙ্কর স্বরূপ যদি আমরা শ্রদ্ধাপূর্বক অনুভব করি তাহলে দেখা যাবে গুরু সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম। গুরু সমস্ত শক্তির প্রতিভূ।

গুরুপূর্ণিমা ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন পরম্পরা।
গুরুপূর্ণিমা ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন পরম্পরা।

গুরু শব্দ পরম্পরাবােধক শব্দ। গুরু শব্দের অর্থ মহান। গুরু তিনিই, যিনি জ্ঞানের দ্বারা চরিত্রের দ্বারা মানবীয় ও ঈশ্বরীয় গুণের দ্বারা শিষ্যকে পুষ্ট করেন। সদ্ গুরু সৰ্বর্ণা ত্যাগ, তপস্যা, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমার প্রতিমূর্তি। এই জন্য গুরুর জীবন অনুকরণীয় ও প্রেরণাদায়ক। গুরুশব্দের শব্দগত বিশ্লেষণ করলে অর্থ হয়- ‘গুকারাে অন্ধকার রকারাে তন্নিরাবকঃ ।। অর্থাৎ অন্ধকার যিনি নিবারণ করেন তিনিই গুরু।

অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ।।

যিনি অজ্ঞানরূপ তিমিরান্ধজীবের চক্ষু জ্ঞানরূপ অঞ্জনশলাকা দ্বারা উন্মীলিত করেন, সেই গুরুকে নমস্কার। ঠিক তেমনি, যিনি জ্ঞানরূপ অঞ্জনশলাকা দিয়ে সমগ্র রাষ্ট্র জীবনের অন্ধকার দূর করেন, তিনিই রাষ্ট্রগুরু।

ভারতবর্ষ গুরুর দেশ। শাস্ত্রে আছে গুরুকে স্মরণ না করলে কোনও কাজ সিদ্ধ হয় না। মানুষের পঞ্চভৌতিক দেহে পঞ্চেন্দ্রিয়ের সংস্কার শুদ্ধির জন্য। গুর মন্ত্র গ্রহণ বাঞ্ছনীয়।

আষাঢ় মাসের পূর্ণিমাকে Guru Purnima  বলা হয়। প্রত্যেক মাসেই পূর্ণিমা আসে। কিন্তু আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় গ্রহের যে অবস্থান থাকে এই সময় বৃহস্পতি অর্থাৎ গুরু গ্রহের তত্ত্ব অন্য পূর্ণিমার চাইতে বেশি হয়। এইজন্য এই দিন গুরুকৃপা ও গুর আশীর্বাদ বেশি প্রাপ্ত হয়। Guru Purnima র অপর নাম ব্যাস পূর্ণিমা। মহর্ষি ব্যাসদেব এইদিনে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ব্যাসদেব বৃহস্পতিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে বৃহস্পতিবারকে গুরুবার বলা হয়।

ব্যাসদেবের নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। মহাভারতের যুগে দু'জন কৃষ্ণ প্রসিদ্ধ ছিলেন এক বাসুদেব কৃষ্ণ' এবং দুই ‘দ্বৈপায়ন কৃষ্ণ। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের আর এক নাম ছিল পরাশর্য। কারণ তিনি পরাশরের পুত্র ছিলেন। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের আর এক নাম ছিল ‘বাদরায়ণ। কারণ উনি উত্তরাখণ্ডের বদরীনাথ ধামের নিকট বদরিকা আশ্রমে কঠিন তপস্যা করে জ্ঞান প্রাপ্ত করেছিলেন। ব্যাসদেব ভারতীয় জ্ঞানকে সুনিয়ােজিত ভাবে সূত্রবদ্ধ ও সুগঠিত করার অভূতপূর্ব কাজ করেছেন। তিনি অপৌরুষের বেদকে ঋক্, সাম, যজুঃ ও অথর্ববেদকে সম্যকরূপে লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ করেছেন। জীবন ও সাহিত্যের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে মহর্ষি ব্যাসদেবের প্রভাব অনস্বীকার্য। তাই ভারতের জনজীবনে Guru Purnima  ও ব্যাসপূর্ণিমা একাকার হয়ে গেছে। ব্যাসজয়ন্তীর এই পবিত্র দিনে ব্যাসদেবকে রাষ্ট্রগুরু হিসাবে ভারতবর্ষের লােক বন্দনা করে ও স্মরণ করে। বেদের প্রাচীনতার মতাে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি পরম্পরাও অতি প্রাচীন। গুরুশিষ্যের পরম্পরার উল্লেখ অনেক শাস্ত্র ও গ্রন্থে আছে।

দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি ও অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের উল্লেখ আছে। মর্যাদা পুরুষােত্তম শ্রীরাম বাল্যকালে বশিষ্ঠের আশ্রমে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। যােগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ সন্দীপনি মুনির আশ্রমে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। চাণক্যের মতাে গুরু চন্দ্রগুপ্তকে চক্রবর্তী সম্রাট তৈরি করেছিলেন। সমর্থগুরু রামদাস বর্বর মুসলমান আক্রমণকারীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য ছত্রপতি শিবাজীর মধ্যে সামর্থ্য বিকশিত করেছিলেন। বৌদ্ধগ্রন্থ অনুসারে ভগবান বুদ্ধ আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার দিন প্রথম পাঁচজন শিষ্যকে উপদেশ দিয়েছিলেন। শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেও গুরুর বিশেষ স্থান রয়েছে। দেহধারীকেই গুরু মানা জরুরি নয়। শিখ সম্প্রদায় ‘গুরু গ্রন্থ সাহেব’কেই গুরু হিসাবে মান্যতা দিয়েছে। একলব্য তাে মাটির তৈরি গুরুর সামনে অস্ত্রশিক্ষা করে মহান ধনুর্ধর হয়েছিলেন।

কিন্তু বিগত শতাব্দীতে গুরুশিষ্য পরম্পরায় অসংগতি দেখা দিয়েছে। সেই জন্যই এই অসংগতি লক্ষ্য করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার সঙ্রে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই গৈরিক ধ্বজকে গুরুরূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সঙ্ঘ কোনও ব্যক্তিবিশেষকে গুরুরূপে স্বীকার করেনি। সঙ্ঘের লক্ষ্য বৈভবশালী  হিন্দুরাষ্ট্রের পুনর্নির্মাণ। এই উদ্দেশ্য পূর্তির জন্যই হিন্দুসংগঠন। এই বৈচিত্র্যময় হিন্দুরাষ্ট্রের সমগ্র মানুষকে এক ব্যক্তি গুরুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা এবং তার ছত্রছায়ায় নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। সেই জন্য ভগােয়া ধ্বজ বা গৈরিক পতাকাই সঘের গুরু। ত্যাগ, জ্ঞান, পবিত্রতা ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাহস, স্ফুর্তি, ত্যাগ ও বলিদানের উৎসাহ বাড়িয়ে তােলে এই গৈরিক পতাকা।

Guru Puja ও গুরুদক্ষিণা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। Guru Purnima র দিন স্বয়ংসেবকরা গৈরিক গুরুর সামনে রাষ্ট্রের প্রতি নিজের নিজের সমর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তপােময় ও জ্ঞাননিষ্ঠ ভারতীয় সংস্কৃতির সর্বাধিক সশক্ত, চির পুরাতন ও নিত্য নতুন প্রতীকের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ গুরুদক্ষিণা হবে তার চিন্তা ও উপদেশ নিজ জীবন ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত করা। তবেই হবে তাঁর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও Guru Purnima  তথা ব্যাস পূর্ণিমা পালনের প্রকৃত সার্থকতা।

লিখেছেনঃ প্রবীর মিত্র

Previous
Next Post »