শ্রীগুরু পূর্ণিমার উৎসের সন্ধানে অভিযাত্রা। Guru Purnima

শ্রীগুরু পূর্ণিমার উৎসের সন্ধানে অভিযাত্রা। Guru Purnima


Guru শুধুই একটি শব্দ নয়। Guru একটি প্রতীক। ভারতীয় পরম্পরার উৎস। ভারতীয় জীবনের সুর বাঁধা গুরতেই। গুরুশব্দের অর্থ বিন্যাস করে রঘুবংশে বলা হয়েছে ‘গকারঃ সিদ্ধিদঃ প্লোক্তো রেফঃ পাপসা হারক উকারাে বিষুব্যক্তস্ত্ৰিতয়াত্মা গুরু পরঃ। যার সাধারণ অর্থ যিনি জীবনের অন্ধকার দূর করেন, তিনিই Guru। এ অন্ধকার শুধু আধ্যাত্মিক জীবনের নয়, এ অন্ধকার জীবনের সর্বক্ষেত্রের। আর এরই ব্যাখ্যা, মানবজীবনে গুরুর সংখ্যা এগারাে।
শ্রীগুরু পূর্ণিমার উৎসের সন্ধানে অভিযাত্রা।
শ্রীগুরু পূর্ণিমার উৎসের সন্ধানে অভিযাত্রা।

মানব জীবনের এই একাদশ Guru হলেন উপাধ্যায় অর্থাৎ শিক্ষক, বাবা, বড়াে ভাই, রাজা, মামা, শ্বশুর, পিতামহ, মাতামহ, বর্ণশ্রেষ্ঠ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, পিতৃব্য এবং অবশ্যই দীক্ষাদাতা মন্ত্রদ্রষ্টা শুরু।

এখন অবশ্য সাধারণভাবে মন্ত্রদাতাকে গুরু হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আর সেই কারণেই গুরুপূজার জন্য নির্দিষ্ট আষাঢ়ের পূর্ণিমাটি মানুষের কাছে Guru Purnima হিসেবেই খ্যাত। ভারতীয় পরম্পরায় কিন্তু এদিন শুধু দীক্ষাদাতা নয়, জীবনের একাদশ রকেই স্মরণ এবং Puja করা হয় জানানাে হয় কৃতজ্ঞতা। জীবনের সবকিছুই যে ওই গুরু আশীর্বাদে এই কথা স্মরণ করে মানুষ বিনম্র হওয়ার শিক্ষা নিয়ে থাকে।

অতীতে Guru Purnima দিনে একাদশ গুরুকেই স্মরণ করা হতাে। কিন্তু এখন শুধু আধ্যাত্মিক জীবনের দ্রষ্টা মন্ত্রদাতা দীক্ষাগুরকে Puja করা হয় গুরু পর্ণিমায় (Guru Purnima)। এই প্রসঙ্গেই স্মরণ করা যায় পাশ্চাত্যে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরের একটি দিনকে 'Thanks Giving Day' হিসেবে চিহ্নিত করে অতীতকে স্মরণ করা হয়। ভারতীয় চেতনায় অবশ্য কেবল ওই একটি দিন নয়। বছরের প্রতিটি দিনই অতীত যা উৎসের প্রতি নিবেদিত। প্রতিদিনই সন্ধ্যা তর্পণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় জীবনের ওই উৎসটিকে। প্রাত্যহিক ক্রিয়াকর্মের মধ্য দিয়ে পরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ভারতীয় জীবনের বৈশিষ্ট্য।

ভারত ও নেপালের একটি জাতীয় অনুষ্ঠান পর্ব এই Guru Purnima। দেশের Hindu, Jain ও Buddha ধর্মের মানুষ এই দিনটি পালন করেন পরম শ্রদ্ধায় মূলত দীক্ষাদাতা ও শিক্ষাদাতা গুরুকে শ্রদ্ধা জানানাের জন্য।  বলা হয়, গুরু পূর্ণিমার (Guru Purnima) দিনটি বছরের অন্যসব দিনের চেয়ে হাজারগুণ ফলপ্রসূ। তাই এই দিন Guru Puja করা হয় বিশেষ নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। বর্তমান ও অতীত গুরুদের একইসঙ্গে শ্রদ্ধা জানানাে হয় এই দিন।

ভারতীয় পরম্পরায় বিশ্বাস, বর্তমান। দেহ ধারী গুরু প্রকৃতপক্ষে অতীতের সেই আদিগুরুর ধারাকেই বহন করে চলেছেন। তার Puja মধ্য দিয়ে সেই পরম গুরু পরমব্রহ্মেরই সন্নিধানে সমাবিষ্ট হওয়ার এক দুর্লভ সুযােগ আসে মানব জীবনে। Hindu পরম্পরায় গুরু হলেন পরব্রহ্মর প্রতীক। তিনিই এই স্থূলদেহধারী গুরুর মাধ্যমে উত্তর পুরুষদের শ্রদ্ধা ও Puja গ্রহণ করেন। দূর করেন জীবনের সব অন্ধকার। দেখান জ্যোতির্ময় জীবনকে। এই আলি গুরু কখনও পরমদেবতা Shiva, কখনও vishnu, কখনও brahma কখনও বা তিনি Ved বিভাজক ব্যাসদেব।

বৌদ্ধরা মনে করেন, 'ভগবান তথাগত বুদ্ধদেবই হালেন আলিগুরু। বুদ্ধদেব এই পুণ্যদিনেই সারনাথে প্রথম উচ্চারণ করেন তার অমৃতবাণী যা মানুষকে মুক্তির পথ দেখাত। গুর পূর্ণিমায় বিশেষ Puja র  মাধ্যমে তাই স্মরণ করা হয় তাকে। এই দিন বুদ্ধদেব তার প্রথম পাঁচজন শিষ্যকে যে উপদেশ দেন তা 'ধম্মচৰূপবানম্নামে খ্যাত।'

জৈন পরম্পরায় আছে, ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর কৈবল্য লাভের পর এই  দিনটি শুরু করেন তার চাতুর্মাস্য ব্রত বা চার মাসের বর্ষায় সাধনার একটি ক্রম। এই দিনটি তিনি প্রথম দীক্ষা দেন ইন্দ্রভূতি গৌতমকে, যিনি পরবর্তীতে খ্যাত gautam swami নামে। এই দিনই তিনি হন ত্রিলােক গুহ। তাই জৈনদের কাছে এই দিনটির অন্য নাম ত্রিলােক Guru Purnima । আচার্যদের শ্রদ্ধা জানাবার পর্ব এটি।

Hindu যােগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, আদি গুরু হলেন Shiva । অনাদি এক অতীতে হিমালয়ের পুণ্যক্ষেত্রে যােগমগ্ন হন তিনি। তার দেহে সেসময় ছিল না কোনও প্রাণের সাড়া। ধ্যানমগ্ন Shiva কে দর্শনের জন্য চারদিক থেকে আসেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু তার কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে চলে যান সকলেই থেকে যান শুধু সাতজন। বহু বর্ষ পরে, যােগসমাধি থেকে বুঙ্খিত হন Shiva । দেখেন তার সামনে বসে আছেন সাতজন। তারা তার কাছে উপদেশ চান। Shiva থাকেন নীরব। বস্তুত প্রত্যাখ্যান করেন তাদের। কিন্তু সেই সাতজন একইভাবে অনুনয় বিনয় করাতে থাকেন।

অবশেষে আশুতােষ Shiva বলেন, উপদেশ দিলেই তাে গ্রহণ করতে পারবে না তা। তার জন্য প্রস্তুত করতে হবে নিজেকে। আগে তৈরি করে নিজেকে। এই বলে তিনি তাদের দেন প্রস্তুতির শিক্ষা।

চলে অপেক্ষা এক আধদিন নয় মাস, বছর পেরিয়ে কেটে যায় তাদের ৮৪ বছর এক নিবিড় সাধনায়। তারপর দক্ষিণায়নের সময় আবার ধ্যান ভাঙে শিবের। দেখেন সাধনায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে তার ওই সাত ভক্তের দেহ। তাই পরের আষাঢ়ি পূর্ণিমার দিনে তিনি তাদের দেন যােগ শিক্ষা। সেই সপ্তসাধক হন সপ্তর্ষি। প্রচার করেন যােগসাধনার কথা। আর তখন থেকেই Shiva হন আদিগুরু। এই দিন শিক্ষা দেন তিনি তার এই সাত শিষ্যকে। যােগের সাতটি বিশেষ ধারা সম্পর্কে। আজও যােগ সাধনার মৌলিক ভিত্তি সেই সাধন ধারা। Guru Purnima  তাই সেই আদিগুর শিবেরও পূজা যা গ্রহণ করেন তিনি পার্থিব গুরলের মাধ্যমে। এই Guru Purnima র দিনই যমুনার এক দ্বীপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। দিনটি তাই খ্যাত ব্যাস পূর্ণিমা নামেও। ব্যাস সুবিশাল বেদকে ঋক্, যজু, সাম ও অথর্ব এই চার খণ্ডে বিভক্ত করেন। এই বেদই হলাে সনাতন ধর্মের মূল। তাই বেদ বিভাজক
ব্যাসকেও এই আদিগুরু হিসেবে পূজা করা হয় আষাঢ়ের এই বিশেষ পূর্ণিমা তিথিতে।

নেপালে গুরু পূর্ণিমার দিনটি পালিত হয় ত্রিলােক গুহ পূর্ণিমা নামে। এই দিনটিই নেপালের জাতীয় শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের বিশেষ শ্রদ্ধা জানানাে হয় এই দিনটিতে। সব মিলিয়ে ভারতীয় জীবনে Guru Purnima নিছকই একটি আনুষ্ঠানিক পর্ব নয়। এটি হলাে জীবনাকে খুঁজে পাওয়ার, তার উৎস বা শিকড়ের সন্ধান পাওয়ার ও স্পর্শ করার দিন। অতীত এবং উৎসের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ারও দিন এটি। এই দিনটি প্রগতির এক অনন্ত ধারা। চিরন্তনের এক অপূর্ব প্রকাশ।

লিখেছেনঃ নন্দলাল ভট্টাচার্য

Previous
Next Post »