অরন্ধনে মায়েদের ছুটি

অরন্ধনে মায়েদের ছুটি

অরন্ধনে মায়েদের ছুটি


আজ থেকে অর্ধশতাব্দী পূর্বে ভারত তথা বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র যৌথ পরিবার ছিল। যৌথ পরিবারে বাড়ির গৃহিণী বা গৃহকত্রীকে প্রত্যহ অনেক লােকের রান্নাবান্না করতে হােত। সেকালে যৌথ পরিবারের মায়েরা রান্নাবান্না থেকে ছুটি পেতেন না। প্রত্যহ গৃহে উনুন জ্বালানাে ও রান্না করা একটা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ ছিল। এর থেকে মায়েদের পরিত্রাণ ছিল না। বর্তমানে শহর কলকাতায় ও শহরতলিতে লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে সকালেনা হলেও সন্ধ্যাতে উনুন বা গ্যাস জ্বালানাে বারণ। অফিস ফেরত বাবুরা বিভিন্ন খাবারের দোকান থেকে রুটি তরকারি কিনেই বাড়িতে ঢুকছেন, আবার কারাে কারাে গৃহে মাসিক ব্যবস্থা, তৈরি করা। খাবার নির্দিষ্ট সময়ে গৃহে পৌঁছে যাচ্ছে। যাকে এখন হােম সার্ভিস নামকরণ করা হয়েছে। মুঠিফোনে শুধুই খবরের অপেক্ষা। টাকার ব্যবস্থা ক্যাশলেশ সিস্টেমে, কোনাে চিন্তা নেই।

অরন্ধনে মায়েদের ছুটি
অরন্ধনে মায়েদের ছুটি

এই প্রসঙ্গে ব্যক্তি জীবনে বাল্যে, কৈশােরে যতদিন গ্রামের বাড়িতে মায়ের কাছে ছিলাম, তখন গরম ভাত দুই লাে খাইনি এমনদিন স্মরণ করা কষ্টকর। এক আধ দিন হয়ত বা মায়ের জ্বর হয়েছে কিন্তু রান্না কোনােদিনই বন্ধ হয়নি। আর দেখতাম ঘরের এতগুলাে লােক, তার পর নিত্য দু'চারজন অতিথি হাজির। প্রত্যেক দিনই মাকে বেশি করে চাল নিয়ে রান্না করতে দেখতাম। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন তিথিদেখে আসে না বলেই তারা অতিথি এই ভাবনা এখন আর কেউ ভাবেন বলে মনে হয় না। আমরা নারী স্বাধীনতার যুগে বাস করি কিনা তাই ওসব ভাবনা অচল।


হয়তাে বলবেন যে তক্কালে সমাজে নারীদের প্রতি অবিচার করা হােত। তাদের স্বাধীনতা ছিল না। ক্রীতদাসীদের মতাে নিত্য রান্নাবান্না করতে হােত একদিনও বাদ যেত। এই কথাটি কিন্তু ঠিক নয়। সনাতন ভারতবর্ষে প্রজ্ঞাবান ঋষিরা স্ত্রীলােকেদের স্বাধীনতা দিয়ে তাদেরও ছুটির ব্যবস্থা করে দিলেন। তবে আমাদের সমস্ত কর্মের কৃত্যানুষ্ঠানের পশ্চাৎপটে ধর্মকে স্থান দেওয়া হয়েছে।নব্বর্ষায় আষাঢ়ের অম্বুবাচীকে যেমন পক্ষান্তরে চাষিদের ছুটির দিন হিসেবে ঘােষণা করা যায় তেমনি অরন্ধনকেও আমাদের মা বােনেদের ছুটির দিন হিসেবে গণ্য করা যায়। এখন এই অরন্ধন বিষয়টি কী সে সম্বন্ধে আলােচনা করা যাক।


অনুষ্ঠানিক ভাবেরান্না না করাকে অরন্ধন বলে। বাংলাদেশে ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে ও আশ্বিন মাসের সংক্রান্তিতে অরন্ধনের রীতি আছে। কোনাে কোনাে স্থানে দশহরার দিন থেকে শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতি পঞ্চমীতে ও অন্যান্য দিনে অরন্ধন পালিত হয়ে থাকে। সাধারণ লােকেরা এই রান্না না। করার রীতিকে আরন্ধ বলে, অরন্ধনের পূর্ব রাত্রিতে বাড়ির স্ত্রীলােকেরা অন্নব্যঞ্জনাদি বেঁধে রাখেন এবং ভাত নষ্ট হয়ে যাবে বলে, ভাতে জল দিয়ে রাখেন। অরন্ধনের দিন উনুন জলিতে নেই এবং আগুনের কাছে মায়েদের যেতে নেই। ওইদিন গৃহিণীরা উনুনের বাইরে ও ভিতরে আলপনা দেন এবং ঘরে মনসা পূজা করেন। কোথাও কোথাও উনুনের ভিতর মনসা গাছের ডাল রেখেও মনসা পূজা করা হয়ে থাকে। আর পূর্বরাত্রে রান্না করা বাসি ভাত তরকারি খাওয়ার প্রথা। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে যে অরন্ধন পালিত হয় তাকে বৃন্ধাৱন্ধন বলে।ওই অরন্ধন যদি ভাদ্র মাসের অন্যদিন অনুষ্ঠিত হয়, তখন তাকে ইচ্ছারন্ধন বলে। এই প্রথাতে বাসি অন্ন-ব্যঞ্জন মনসা দেবীকে উৎসর্গ করে গ্রহণ করবার রীতি।


স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে অরন্ধন অনুষ্ঠান করা হয় কেন? উত্তরে বলা যায় সমাজকে বাদ দিয়ে ধর্মানুষ্ঠান হতে পারে না। এক সময় বিশেষত ইংরেজ রাজত্বের পূর্বে বাংলাদেশে তাতি ও কর্মকার সম্প্রদায়ের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। তখন দেশীয় তাঁতিরা তাঁতে বুনে কাপড় গামছা তৈরি করতেন। আর কর্মকারেরা নানান লােহার যন্ত্র সাজসরঞ্জাম তৈরি করত। পরবর্তীকালে ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লব ও ইংরেজ রাজত্বের সূচনাতে দেশি তাঁতশিল্প ও দেশীয় ধাতুশিল্প ভীষণভাবে মার খেল। বাংলাদেশে আশ্বিন মাসে দুর্গা পূজা, ওই সময় সকলেই কম বেশি নতুন পােশাক পরিচ্ছদপরেন। ভাদ্র সংক্রান্তির পূর্বেই মােটামুটি আবার বােনার কাজ শেষ।তাতিলের এখন তাঁতঘর পরিষ্কার করবার সময়। ছেলেরা যেমন তাঁত ঘর পরিস্কার বা মেরামতিতে ব্যক্ত তেমনি স্ত্রীলােকেরাও রান্না না করে সকলে ওই কর্মে ব্যস্ত, ভাদ্রসংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পূজা। পুজোয় যেমন আনন্দ আছে, তেমনি ঘুড়ি ওড়ানাে প্রভৃতিও আছে। আনন্দ করতে হলে সকলেই একসঙ্গে করুক। কিন্তু যদি মেয়েরা রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকে তবে এই আনন্দ উৎসব সমভাবে উপভােগ্য হয় না। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র তাতি ও কর্মকার সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অরন্ধন বিশেষভাবে পালনীয়।


বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বঙ্গভঙ্গ উপলক্ষে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তিতে এক ব্যতিক্রমী। অরন্ধনের প্রবর্তন করা হয়েছিল। ওইদিন দুঃখ প্রকাশের জন্য উপবাস ও ঐক্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে রাখীবন্ধনের ব্যবস্থা করেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে আরাে কিছুদিন অরন্ধনের প্রথা প্রচলিত আছে।

লিখেছেনঃ দেবপ্রসাদ মজুমদার

COMMENTS

Name

Affiliate Marketing,2,Blogging,16,Freedom Fighter Of India,2,Google Adsense,1,Hospitals and Doctors,1,Make money Online,2,Movies,2,News,1,Recipes,2,Religious History,5,SEO,1,এস এম এস,2,গল্প,2,চিঠি পত্র,1,জোকস,2,ধর্ম/Religion,7,পরম্পরা,23,বাস্তব চিত্র,1,বিনোদন,1,বিশেষ প্রতিবেদন,3,মনীষী কথা,1,সুস্বাস্থ্য,16,
ltr
item
SANATANBLOG: অরন্ধনে মায়েদের ছুটি
অরন্ধনে মায়েদের ছুটি
অরন্ধনে মায়েদের ছুটি
https://2.bp.blogspot.com/-kEnYjwu8VLg/W5ZSRUxO7hI/AAAAAAAAAGs/fRTRne7BThcmWd_wAE4FtAJKO-BP9vQcgCLcBGAs/s640/Untitled-1.jpg
https://2.bp.blogspot.com/-kEnYjwu8VLg/W5ZSRUxO7hI/AAAAAAAAAGs/fRTRne7BThcmWd_wAE4FtAJKO-BP9vQcgCLcBGAs/s72-c/Untitled-1.jpg
SANATANBLOG
https://www.sanatanblog.com/2018/09/mothers-holiday-in-hindu-culture.html
https://www.sanatanblog.com/
https://www.sanatanblog.com/
https://www.sanatanblog.com/2018/09/mothers-holiday-in-hindu-culture.html
true
1474789154410012307
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy