পৌরাণিক কিরাত দেশ।

 পৌরাণিক কিরাত দেশ।


পৌরাণিক নগরগুলির মধ্যে কিরাতগােষ্ঠী ও কিরাতদেশ উল্লেখযােগ্য। হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলের আদিবাসীদেরই বিশেষ ভাবে ‘কিরাত' বলা হতাে। ব্রহ্মপুত্রবিধৌত অঞ্চল, ভােটদেশের কতকাংশ, পূর্ব নেপাল ও ত্রিপুরা রাজ্য মুখ্যত ‘কিরাত দেশ’ বলে অভিহিত হতাে।


কিরাতদের অস্তিত্বের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় যজুর্বেদে। বাজেসনেয়িসংহিতা (৩০, ১৬) এবং তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এদের ‘পার্বত্যগুহাবাসী’ বলা হয়েছে। মহাভারতের কোনও কোনও পর্বে কিরাত গণকে ‘হিমবর্গনিলয়া’ বলা হয়েছে। মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন বিদেহ রাজ্য অতিক্রম করে পূর্বাঞ্চলে সাতটি কিরাতরাজ্যের রাজাদের যুদ্ধে পরাজিত করেন। মহাভারতের সভাপর্বে কিরাতগণ ভীষণ ও নিষ্ঠুর বলে বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধে ও শিকারে তাদের বিশেষ নৈপুণ্য ছিল। সুশ্রী ও গৌরবর্ণ কিরাতগণ পশুচর্ম পরিধান করত এবং তাদের মাথার জটা ত্রিকোণাকার চূড়া করে বাঁধা থাকত।

 পৌরাণিক কিরাত দেশ।
 পৌরাণিক কিরাত দেশ।


কিরাতগণ ভারতের প্রাচীনতম আদিবাসীদের অন্যতম জাতি। কিরাতগণ মঙ্গোলীয় বা পীতজাতি থেকে উদ্ভূত বলে অনুমান করা হয়। বিশেষত চীনা ও ভােটজাতির আকৃতিগত লক্ষণাদির সঙ্গে এদের যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সংস্কৃতে কিরাত বলতে সাধারণত অসভ্য বন্য পার্বত্য উপজাতি বােঝায়, কিন্তু এরা অস্টিক ভাষাভাষী কোল, শবর প্রভৃতি মধ্যভারতীয় আদিবাসীদের থেকে পৃথক।


ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক পণ্ডিতগণের মতে মঙ্গোলীয় গােষ্ঠীর কিরাত জাতি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে ভারতের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে এসে উপস্থিত হয় এবং মে হিমালয়ের পূর্বে ও উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ক্রমশ তাদের স্বাভাবিক সাহস ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা সমভূমির আর্যদের দ্বারাও সমাদৃত হতে থাকে। প্ৰাগজ্যোতিষাধিপতি ভৌমবংশীয় রাজা ভগদত্ত চীন ও কিরাতবাহিনী পরিবৃত্ত হয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষে তুমুল সংগ্রাম করেছিলেন (মহাভারত সভাপর্ব ২৬.৯)। ক্রমে তাদের সামাজিক মর্যাদাও বাড়তে থাকে। স্মৃতিকার মনু কিরাতদের ব্রাত্য বা বৃষল ক্ষত্রিয় হিসাবে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক কাঠামাের অন্তর্ভূক্ত করেন (মনুসংহিতা-১০,৪৪)।মনুস্মৃতির ভাষ্যকার মেধাতিথি কিরাতদের নিম্নশ্রেণীর ক্ষত্রিয় বলে বর্ণনা করেছেন। প্রাচীনগ্রিক ঐতিহাসিকদের বিবরণীতেও কিরাতদের সম্পর্কে বহু তথ্যাদি পাওয়া যায়।


টলেমি ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ওসনদীর উপকূলস্থ অপর একাকিহাদার এর কথা বলেছেন। দিওনিসিআকার বর্ণনাতেও উরসায় (আধুনিকহাজারা জেলা) বসবাসকারী আসপাসিয় উপজাতির পার্শ্ববর্তী কিহাদাইদের উল্লেখ করেছেন। এরা পশুচর্মের নৌকা ব্যবহার করত। সম্ভবত পার্বত্য কিরাতজাতির একটি শাখা ওই অঞ্চলে বসবাস করত।


কিরাত জনগােষ্ঠী ক্রমে ভারতের নানা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক যুগের শিলালিপিতেও কিরাতদের উল্লেখ আছে। নাগার্জুনীকোণ্ডা শিলালিপিতে বর্ণিত আছে যে শ্রীশৈলবিহারে যে সব বৌদ্ধ শ্ৰমণ আসতেন ‘চিলাত তাদের অন্যতম। চিলাত’ কিরাত শব্দেরই প্রাকৃত রূপ। সাঁচির বৌদ্ধস্তুপের প্রস্তর বেষ্টনীর উপরেও ‘চিরাতীয়’ (কিরাতীয়) উপাসকের নাম উল্লেখ আছে। খ্রিস্টিয় নবম শতাব্দীর গুর্জর প্রতিহার নৃপতি ২য় নাগভট্টের গােয়ালিয়র প্রশস্তিতে অপরাপর জাতির সঙ্গে কিরাত জাতিও তার দ্বারা বিজিত হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। প্রাচীন গঙ্গরা ২য় মারসিংহের আনুমানিক দশম শতকের শ্রবণবেলগােলা শিলালিপিতে বিন্ধ্যপর্বতবাসী এক কিরাত উপজাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের বনপর্বে কিরাতরূপী শিবের সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধের কাহিনি এবং পরবর্তীকালে সেই কাহিনি নিয়ে রচিত ভারবির ‘কিরাতাৰ্জ্জুনীয়’ কাব্য আসমুদ্র হিমাচলব্যাপী ভারতবাসীর কাছে ‘কিরাতজাতিকে পরিচিত করে তুলেছে। নেপালের পূর্বাঞ্চলে ‘কিরাত’নামে মঙ্গোলীয় একটি জাতির বসবাস আছে। অনেক গবেষক এদের ‘কিরাতজাতির বংশধর মনে করেন। পৌরাণিক কিরাত দেশের অস্তিত্ব আজ আর নেই, কিন্তু কিরাত জাতির লােকেরা ভারতের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে আছে।।

লিখেছেনঃ গােপাল চক্রবর্তী

Previous
Next Post »