প্রাচীন রাজবংশ কলচুরি (চেদি) ।

প্রাচীন রাজবংশ কলচুরি (চেদি) ।


পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে কলচুরিগণ চন্দ্রবংশীয় যযাতির পৌত্র সহস্রার্জুনের পৌত্র হৈহয়ের বংশধর। এটি মধ্য ভারতের এক প্রাচীন রাজবংশ।

এই পৌরাণিক রাজবংশ কালে কালে বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে। প্রাচীন শিলালিপিতে হৈহয়, চেদি, কলছুরি, কটচুরি, কলসুরী, কুলচুরি প্রভৃতি নামেও এই রাজবংশের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বংশের অন্যতম নৃপতি শিশুপাল (চেদিরাজ) কৃষ্ণের বিরােধী এবং কুরুপতি দুর্যোধনের অন্যতম মিত্র ছিলেন। এই বংশের আদি বাসস্থান নর্মদা উপত্যকা অঞ্চল। প্রাচীন রাজধানী ছিল মাহিনতী বা মান্ধাতা। অবন্তিও কলচুরি রাজ্যভুক্ত ছিল।

ষষ্ঠ শতাব্দীতে কলচুরি রাজ্য দক্ষিণে নাসিক, পশ্চিমে গুজরাট উপদ্বীপ ও পূর্বে বুন্দেলখণ্ড,বাঘেলখণ্ডের বৃহৎ অঞ্চল সমেত গাঙ্গেয় উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর কলচুরিগণ মধ্যনর্মদা উপত্যকায় রাজ্য স্থাপন করে। ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে দাক্ষিণাত্যের চালুক্যবংশ ও পরে উত্তরাংশে গুর্জরপ্রতিহারগণ কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে কলচুরিদের রাজ্য ও প্রতিপত্তি হ্রাস পায়। কলচুরিগণ অতঃপর পূর্বদিকে মধ্যপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলে রাজ্য স্থাপন করে। বিভিন্ন অঞ্চলে কলচুরিবংশের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণে কল্যাণীর কলচুরি বংশ এইরূপ এক শাখা। উত্তর ভারতে কলচুরিগণের মধ্যে গােরক্ষপুর, মালব, তুম্মান বা রত্নপুর এবং দাহল (ত্রিপুরী) বা চেদির কুলচুরি বংশ বিশেষ উল্লেখযােগ্য।

প্রাচীন রাজবংশ কলচুরি (চেদি) ।
প্রাচীন রাজবংশ কলচুরি (চেদি) ।

নর্মদাতটস্থ দাহনের কলচুরি বংশ প্রায় তিনশত বছর রাজত্ব করে। এই বংশের প্রথম রাজা কোৰূল্প বা কোকূলের আনুমানিক রাজত্বকাল ৮৭০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ। কোক্কলের পুত্র শঙ্করগণের সময় কলচুরি রাজ্যের রাজধানী হয় ত্রিপুরী (বর্তমানে জব্বলপুরের নিকটস্থ তেওয়ার গ্রাম)। পরবর্তীকালের উল্লেখযােগ্য রাজা। গাঙ্গেয়দেব (১০০৮ খ্রিঃ) অঙ্গ, কীর, কুন্তল, উৎকল ইত্যাদি দেশের রাজন্যবর্গকে পরাজিত করেন। তিনি নিজনামে মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। গাঙ্গেয়দেবের পুত্র কর্ণ বা লক্ষ্মীকর্ণ (১০৪১-৭৩ খ্রিঃ) কলচুরি বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। চালুক্যরাজ ভীমের সহযােগিতায় ইনি ভােজরাজ পরমারকে পরাস্ত করেন। রাজ্য বিস্তারের জন্য পাণ্ড্য, মুরল, বঙ্গ, গুর্জর, হূণ, কীর ও চন্দেল্লদের পরাভূত করে মগধ আক্রমণ করেন। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে তিনি মুসলমান আক্রমণ প্রতিরােধ করেছিলেন।

পরবর্তী রাজাগণের মধ্যে যশঃকর্ণ, গয়াকর্ণ, নরসিংহ, জয়সিংহ বিজয় সিংহ, অজয়সিংহ প্রভৃতি নাম উল্লেখযােগ্য। পার্শ্ববর্তী রাজ্য সমুহের আক্রমণে, অভ্যন্তরীণ গোলযােগ ও মুসলমান আক্রমণের ফলে দাহলের কলচুরি রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে লুপ্ত হয়।

অনেক পৌরাণিক নগর ও রাজবংশের মতাে কলচুরিদের অস্তিত্বও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল এবং এদের শাখা প্রশাখাও ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। কোক্কলের অন্যতম পুত্র কলিঙ্গরাজ দক্ষিণ কোশলের (বর্তমান ছত্তিশগড় রাজ্য) তুম্মানে (বিলাসপুর জেলাস্থ তুমনা গ্রাম) একটি পৃথকরাজ্য স্থাপন করেন। এই বংশটি রত্নপুরের (অধুনা বিলাসপুর জেলার রতনপুর গ্রাম) কলচুরি বংশ নামেও খ্যাত। লক্ষ্মীকর্ণের। রাজত্বকাল পর্যন্ত তুম্মান বা রত্নপুরের কলচুরিগণ দাহলের কলচুরি বংশের অধীন ছিল। সম্ভবত রাজা পৃথ্বীদেবের সময় তুম্মানের কলচুরিগণ স্বাধীন হয়। ছত্তিশগড় অঞ্চলে এই কলচুরি বংশ অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজত্ব করে। কলচুরিগণ একটি নতুন অব্দ প্রচলন। করে। এর আরম্ভ ২৪৮-৪৯ খ্রিস্টাব্দ। পরবর্তীকালে মুসলমান আগ্রাসনের ফলে কলচুরিদের নগর ও স্বাতন্ত্র বিলুপ্ত হয়।

লিখেছেনঃ গােপাল চক্রবর্তী

Previous
Next Post »