স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণ ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩

স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণ - ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩


আমেরিকায় শিকাগাে ধর্মমহাসভার প্রথম দিবসের অধিবেশনে সভাপতি কার্ডিন্যাল গিবস শ্রোতুমণ্ডলীর নিকট গৈরিকসনধারী স্বামী বিবেকানন্দের পরিচয় করাইয়া দিলেন। স্বামীজী সেই শ্রোতৃগণকে “আমেরিকাবাসী ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ” । বলিয়া সম্বােধন করিলেন। অশ্রুতপূর্ব সম্বােধনে অভিভূত শ্রোতৃগণ কয়েক মিনিট ধরিয়া তুমুল করতালি দ্বারা সকলেই তাহাকে অভিনন্দিত করিতে লাগিলেন। পরে তিনি নিম্নোক্ত অভ্যর্থনা-সূচক বাক্যে কিছু বলিলেন :

অভ্যর্থনার উত্তর

হে আমেরিকাবাসী ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ, আজ আপনারা আমাদিগকে যে আন্তরিক ও সাদর অভ্যর্থনা করিয়াছেন, তাহার উত্তরদানের জন্য আমি দণ্ডায়মান হইয়াছি- ইহাতে আজ আমার হৃদয় আনন্দে উচ্ছসিত হইয়া উঠিতেছে। পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসি সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি। সর্বধর্মের প্রসূতি-স্বরূপ যে সনাতন হিন্দুধর্ম, তাহার প্রতিনিধি হইয়াআমি আজ আপনাদিগকে ধন্যবাদ প্রদান করিতেছি এবং কি বলিব পৃথিবীর যাবতীয় হিন্দুজাতির ও যাবতীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর হইয়া আমি আজ আপনাদিগকে হৃদয়ের সহিত ধন্যবাদ জানাইতেছি।

স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণ ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩
স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণ ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩

এই সভামঞ্চে সেই কয়েকজন বক্তাকেও আমি ধন্যবাদ জানাই, যাঁহারা প্রাচ্যদেশীয় প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিলেন যে, অতি-দূর-দেশবাসী জাতিসমূহের মধ্য হইতে যাহারা এখানে সমবেত হইয়াছেন, তাহারা বিভিন্ন দেশে পরধর্ম-সহিষ্ণুতার ভাব-প্রচারের গৌরব দাবি করিতে পারেন। যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল সমদর্শন ও সর্ববিধ মত-গ্রহণের বিষয় শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা যে কেবল অন্য ধর্মাবলম্বীর মত সহ্য করি, তাহা নহে—সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভাষায় ইংরেজি 'এক্সকুশান’ (অর্থাৎ হেয় বা পরিত্যাজ্য) শব্দটি কোনােমতে অনুবাদ করা যায় না, আমি সেই ধর্মভুক্ত। যে জাতি পৃথিবীর সমুদয় ধর্ম ও জাতিকে, যাবতীয় ত্রস্ত উপদ্রুত ও আশ্রয়লিঙ্গু জনগণকে চিরকাল অকাতরে আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত বলিয়া। নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি আপনাদিগকে বলিতে গর্ববােধ করিতেছি যে, যে বৎসর রােমানদিগের ভয়ঙ্কর উৎপীড়নে  ইহুদীজাতির পবিত্র দেবালয় চূর্ণীকৃত হয়, সেই বৎসর তাহাদের। কিয়দংশ দক্ষিণ-ভারতে আশ্রয়লার্থ আসিলে আমরাই তাহাদিগকে সাদরে গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং আজও তাহাদিগকে আমাদের হৃদয়ে ধারণ করিয়া আছি। জরথুষ্ট্রের অনুগামী সুবৃহৎ পিরসীক জাতির অবশিষ্টাংশকে যে ধর্ম আশ্ৰদান করিয়াছিল এবং আজ পর্যন্ত যে ধর্ম তাহাদিগকে  প্রতিপালন করিতেছে, আমি সেই ধর্মর্ভুক্ত।


কোটি কোটি নরনারী যে স্তোত্রটি প্রতিদিন পাঠ করেন এবং যাহা আমি অতি বাল্যকাল হইতে আবৃত্তি করিয়া আসিতেছি, তাহার একটি শ্লোকের অংশ আজ আপনাদের নিকট উদ্ধৃত করিয়া বলিতেছি--- “রচীনাং বৈচিত্র্যাজুকুটিলনানা পথজুষাং। নৃণামেকো গম্যমসি পাসামৰ্ণৰ ইব।।” অর্থাৎ, হে প্রভাে, বিভিন্ন পথে গিয়াও যেরূপ সকল নদী একই সমুদ্রে পতিত হয়, ভিন্ন ভিন্ন রচিহেতু সরল ও কুটিল প্রভৃতি নানা পথগামীদেরও তুমিই সেইরূপ একমাত্র গম্য স্থান।


এই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মমহাসম্মেলন গীতাপ্রচারিত সেই অদ্ভুত সত্যেরই পােষকতা করিতেছে, যাহা বলিতেছে—“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈৰ ভজাম্যহম্। মম বানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থসর্বশঃ।।”  অর্থাৎ, যে যেরূপ মত আশ্রয় করিয়া আসুক কেন, আমি তাহাকে সেইভাবেই অনুগ্রহ করিয়া থাকি। হে অর্জুন, মনুষ্যগণ সর্বতােভাবে আমার নির্দিষ্ট পথেই চলিয়া থাকে।


সাম্প্রদায়িকতা সঙ্কীর্ণতা ও উহাদের ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল ধরিয়া আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে। জগতে ইহারা মহা উপদ্রব উৎপাদন করিয়াছে, কতবার ইহাকে নরশােণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে সময়ে সময়ে হতাশায় নিমগ্ন করিয়াছে। এইসকল ভীষণ পিশাচ যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানব-সমাজ আজ যে অবস্থায় রহিয়াছে তদপেক্ষাকতদূর উন্নত হইতে পারিত! কিন্তু আজ ইহার মৃত্যুকাল উপস্থিত হইয়াছে এবং আমি সর্বতােভাবে আশা করি যে, এই ধর্মসমিতির সম্মানার্থ আজ যে ঘণ্টাধ্বনি নিনাদিত হইল, উহা সর্ববিধ  ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লেখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্ববিধ নির্যাতনপরম্পরার এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসান-বার্তা ঘােষণা করিবে।



Oldest