যমরাজের হিসাব লেখক চিত্রগুপ্ত

যমরাজের হিসাব লেখক চিত্রগুপ্ত

কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথি ভ্রাতৃদ্বিতীয়া নামে পরিচিত। ওই দিন বােনেরা ভায়েদের দীর্ঘজীবন কামনা করে যম ও যমুনাকে স্মরণ করে। ভায়েদের কপালে ফোটা দিয়ে থাকেন। বাংলা তথা ভারতের সর্বত্রই এই অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যদিও এটাকে অনেকে অর্বাচীন ও লৌকিক ধর্মানুষ্ঠান বলে থাকেন, তথাপি বলা যায় যমের ভগ্নী যমী ভাই যমকে ফোঁটা দিয়ে অমর করেছিলেন।

এই প্রথা বহু প্রাচীন। এই দিন যম ও যমুনার বা যম ভগ্নী যমীর পূজা করা হয়ে থাকে। এই তিথিতে আরও একজনের পূজা করা হয় তিনি হলেন Chitragupta। চিত্র গুপ্ত সম্বন্ধে সাধারণে ধারণা খুব স্পষ্ট নয়, আর কার্তিকী শুক্লা দ্বিতীয়ায় চিত্রগুপ্তের পূজা প্রচলিত থাকলেও তা ব্যাপক নয়। যমরাজের মন্ত্রী, সচিব বা কর্মচারী হিসেবে Chitragupta পরিচিত।


Chitragupta
যমরাজের হিসাব লেখক চিত্রগুপ্ত

শাস্ত্রে ও পুরাণে চিত্রগুপ্তের জন্ম সম্বন্ধে বলা হয়েছে তিনি সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি ব্রহ্মর অঙ্গ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন হলেন, তখন তার সেই ধ্যান নিরত অঙ্গ থেকে নানা বর্ণে চিত্রিত এক পুরুষের আবির্ভাব ঘটল। সেই পুরুষের দুই হাত তিনি এক হাতে মস্যাধার ও অপর হাতে লেখনী ধারণ করে আছেন।

জন্মের পর তিনি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করলেন তাকে কী কাজ করতে হবে? ব্রহ্মা তখন যােগনিদ্রা থেকে উথিত হয়ে পুত্রকে আদেশ করলেন, তুমি যমলােকে যাও, সেখানে ধর্মরাজ যমের সঙ্গে বাস করে মানুষের পাপ পুণ্য বিচার করবার ব্যবস্থা করাে ও যমলােকেই বাস কর। বললেন আমার কায়া থেকে জন্ম হয়েছে বলে তুমি কায়স্থ নামে অভিহিত হবে। যমালয়ে যমের মন্ত্রী বা সচিব হিসেবে মানুষের পাপ পুণ্যের চিত্র বিচিত্র হিসেব গােপন রাখেন বলে ইনি Chitragupta নামে খ্যাত।


জন্মানাের পর Chitragupta মানুষের কপালে ভাবী শুভাশুভ ফলাফলও লিখে থাকেন। এটাই ভাগ্যফল বা কপাল লিখন। যমরাজ চিত্রগুপ্তকে পাপীদের নরক যন্ত্রণা দান করবার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী চিত্রগুপ্তের অম্বষ্ঠ, মাথুর, গৌড়, সেনক, শ্রীবাস্তব প্রভৃতি নটি পুত্রের কথা জানা যায়।

পুরাণ, মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণের কাহিনি থেকে জানা যায় ইম্ফাকুবংশের রাজা সৌদাস চিত্রগুপ্তের পূজা করে পাপমুক্ত হয়ে স্বর্গারােহণ করেছিলেন। এই তিথিতেই মহামতি ভীষ্ম চিত্রগুপ্তের উপাসনা করে তার প্রসাদে ইচ্ছামৃত্যু বরপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

এখন প্রশ্ন জাগে, ভারতবর্ষে কোথায় চিত্রগুপ্তের মন্দির আছে এবং কোথায় তিনি নিত্য সেবিত হন? এই প্রসঙ্গে বলা যায় দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চীপুরমের এক দুর্লভ বিগ্রহ হচ্ছে Chitragupta স্বামীর মূর্তি। এর মন্দির বিষ্ণুকাঞ্চীতে অবস্থিত। “চিত্রগুপ্ত হচ্ছেন যমরাজের হিসাব লেখক, সমস্ত প্রাণী ও দেবদেবী গণের ভালমন্দ সব কাজই তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখেন। কোনাে প্রাণীর মৃত্যুর পরে যমরাজের কাছে গেলে যমের নির্দেশে Chitragupta সেই প্রাণীর গত জন্মের পাপপুণ্য ও ভালমন্দ কাজগুলি বর্ণনা করেন।


যমরাজ সেইমতাে তার সুখ দুঃখ ভােগের ব্যবস্থা করেন। মন্দিরে চিত্রগুপ্তের যে উপবিষ্ট অর্চামূর্তি আছে। তাতে দেখা যায় তিনি বাম হাতে তালপাতার এক পুথি ধরে আছেন, আর ডান হাতে লােহার কলম ধরে পুঁথিতে কিছু লেখার উদ্যোগ করছেন। করনম্বিকে তাঁর পত্নী, পাশেই বিরাজমান। চৈত্রমাসে চিত্রা পূর্ণিমায়  Chitragupta স্বামীর বার্ষিক উৎসব হয়। এই তথ্য দিয়েছেন শ্রী নৃসিংহ রামানুজদাস স্বামী তার দেউলভূমি দক্ষিণাপথে পুস্তকে। মৃত্যুলােকের দেবতা যমের সঙ্গে কোথাও কোথাও চিত্রগুপ্তের পূজা হয়ে থাকে।

লিখেছেনঃ দেবপ্রসাদ মজুমদার

Previous
Next Post »