দুর্গাপুজোয় নারীশক্তির আরাধনা।

দুর্গাপুজোয় নারীশক্তির আরাধনা।

দুর্গা পূজা এসে গেল। পৃথিবী নতুন আলােয় ঝলমল করছে।বর্ষার মেঘ আর নেই। নীল আকাশে অমল ধবল পাল তুলে নৌকোর মতাে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ। কোন দিকে ভেসে যাচ্ছে তারা? এক অজানা অচেনা শক্তির দিকে। সােনালি রােদুর, নীল আকাশ, চারধারের এই উৎসব-উৎসবভাব, সমস্তই সেইশক্তির সেলিব্রেশন। সেইশক্তি কিন্তু নারী শক্তি। কেন নারী শক্তির এই আরাধনা? ধরণীকে অশুভ থেকে মুক্ত করার জন্য। সমাজ সংসারকে অন্যায় থেকে বাঁচানাের জন্য। অসুর বা অশুভের নিধন সম্ভব একমাত্র নারীশক্তির জাগৃতির মধ্যে। নারী না থাকলে সম্ভব নয় অশুভের সংহার।

দুর্গাপুজোয় নারীশক্তির আরাধনা।
দুর্গাপুজোয় নারীশক্তির আরাধনা।

এ হলাে ভারতের উপনিষদের কথা। ভারতের পুরাণের কথা। প্রাচীন ভারত নারীকে বসিয়েছিল পূজার আসনে। আমাদের প্রাচীন ঋষিরা উপলব্ধি করেছিলেন নারীশক্তির জাগরণেই সমাজ সংসার ও সমগ্র দেশের সার্বিক মঙ্গল হতে পারে।

দুর্গাপূজা, কালীপূজা সবই নারীশক্তির জাগরণের মন্ত্রে উদ্যাপিত। আমরা নারীকে ‘শক্তিরূপেন সংস্থিতা'ই বলছি। নারীকে আহ্বান করছি মাতৃরূপে। মাতৃরূপইনারীর পবিত্রতম রূপ। সেই রূপেই নারীকে আমাদের সমাজ ও জীবনের মাঝখানে আহ্বান করি আমরা। হে নারী, শক্তিরূপে আবির্ভূত হও তুমি। সংহার করাে অশুভ শক্তিকে। প্রতিষ্ঠিত করাে শুভ ও মাঙ্গলিক শক্তিকে।


এই হলাে আমাদের প্রার্থনা। কিন্তু প্রাচীন ভারতের এই প্রার্থনা কি সত্য হয়ে উঠেছে?কলুষিত সমাজে সত্যি কি এই প্রার্থনা আমাদের হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়? আমরা নারীশক্তি জাগরণের যে মন্ত্র পড়ি, সেই মন্ত্রে কি গাঁথা আছে আমাদের হৃদয়ের বেদনা ও প্রত্যয়? তা যদি থাকত, তাহলে সারাদেশ জুড়ে, ঘরে ঘরে নারীর এই প্রাত্যহিক লাঞ্ছনা আমরা দেখতে পেতাম না।

প্রতিদিন ঘরে ঘরে নারী লাঞ্ছনার প্রতিবেদন আমরা খবরের কাগজে পড়ছি। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে নারীর শরীর।নারীর অপহরণ ও পাচার তাে লেগেই আছে। বিবাহে নারীর সম্মান ক্রমাগত অপহৃত। ঘরে ঘরে নারী পণ্যবস্তু। কিংবা একশ্রেণীর পুরুষের সম্পত্তি। আধুনিক বিজ্ঞাপনগুলাের দিকে তাকিয়ে দেখুন, অনেক বিজ্ঞাপনেই নারী পণ্য হিসাবে ব্যবহৃত, তার কোনাে মন নেই, শুধুই শরীর। সব থেকে যা দুঃখের তা হলাে, আইন যদিও নারীকে দিয়েছে মর্যাদা ও ক্ষমতা এবং বিস্তত সামাজিক অধিকার, কিন্তু নারী নিজেই জানে না তার কতখানি ক্ষমতা ও অধিকার রয়েছে।

এই নাজানার কারণঅধিকাংশ নারীর শিক্ষার অভাব। আমাদের দেশে নারী-বঞ্চনা ও নারী-দুর্গতির প্রধান কারণই হচ্ছে স্ত্রী-শিক্ষার অভাব। আমরা পুত্র-সন্তানদের লেখাপড়া শেখাবার চেষ্টা করি। কিন্তু কন্যা-সন্তানদের শিক্ষার প্রতি আমরা উদাসীন বা অনুৎসাহী। এখনও গ্রামে কন্যাসন্তান। মানেই বিয়ে দিয়ে অন্যের ঘাড়ে তার দায়িত্ব অর্পণ। এই মনােভাব, এই প্রবণতা আমাদের যতদিন গ্রাস করে থাকবে, ততদিন আমাদের দেশে নারীশক্তির অভ্যুদয় সম্ভব নয়।

নারীশক্তির মূলে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। ইউরােপ আমেরিকায় নারী অর্জন করেছে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শিক্ষার জোরে, নানাবিধ কর্মকাণ্ডের সৌজন্যে। আমাদের বঙ্গে নারীশিক্ষা নেই। তাই কাজ নেই। সে শুধুই সংসারের কাজেই সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতা নষ্ট করছে নারীশক্তির প্রকাশ। নারীশক্তির সার্বিক প্রকাশের জন্য প্রয়ােজন নারীশিক্ষা ও পুরুষের পাশাপাশি কাজের প্রসারিত সুযােগ।

নারীর হাতে অর্থ না থাকলে তাকে পুরুষের উপর পদে পদে নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবেই। তাহলে কীভাবে সম্ভব নারীর জাগরণ? নারীশক্তির জাগরণের দুটো পথ— এক, নারীর শিক্ষা। দুই, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। একসঙ্গে পুরুষ ও নারী পাশাপাশি নারীশক্তির জাগৃতির পথে অগ্রসর। নারীকে দিতে হবে শিক্ষা। নারীকে দিতে হবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। তবেই ঘটবে নারীশক্তির জাগরণ। নারী প্রতিষ্ঠিত হবে সমাজে, সংসারে, কর্মক্ষেত্রে স্বমহিমায়।

Previous
Next Post »