বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অনুষ্ঠান মহালয়া। Mahalaya

বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অনুষ্ঠান মহালয়া

মহালয়া হিন্দু জীবনের এক পরম লগ্ন। ধর্মীয় এই অনুষ্ঠান স্মৃতি ও সত্তার অপূর্ব মেলবন্ধন। ঐতিহ্য তথা অস্তিত্বের গভীরে প্রােথিত এর শিকড়। প্রাপ্তি আর অগ্রগমনের আকাশে প্রসারিত এর ডালপালা। এই একটি অনুষ্ঠান শ্রদ্ধায়, স্মরণে, বিন নিবেদনে পূর্ব ও উত্তরপুরুষদের মধ্যে মিলন ঘটায়। কে আমি? এসেছি কোথা থেকে? প্রথম দিনের সূর্যের এই জিজ্ঞাসার সজীব, সদাভাস্বর। উত্তর এই মহালয়া।

মহালয়া
বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অনুষ্ঠান মহালয়া

Mahalaya স্মরণের অনুষ্ঠান। Mahalaya কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের অনুষ্ঠান। অতীতকে, ঐতিহ্যকে ধন্যবাদ নয়, আন্তরিক প্রণতি জানাবার অনুষ্ঠান। তাই বা কেন, এ হলাে বিশ্বের সব কিছুর সঙ্গে ‘আব্রহ্ম ঔপক্তি’-- সব কিছুকে আপন করে নেওয়ার এক সর্বাত্মক প্রয়াস। এ বিশ্বের সব কিছুই ঈশ্বরের দান। তার ওপর সকলের রয়েছে সমান অধিকার। সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয় কাউকে -- এই বােধে আত্মস্থ হওয়াই মহালয়ার দীক্ষা। ভােগে নয়, সুখ ত্যাগে, সুখ যতটুকু প্রয়ােজন ঠিক ততটুকু গ্রহণে উপনিষদের এই শিক্ষারই অপরূপ প্রতিফলন মহালয়ার শ্রাদ্ধে-তর্পণে। কেন Mahalaya, কী এর তাৎপর্য -- তার গভীরে যাওয়ার আগে বরং শােনা যাক একটি পৌরাণিক কাহিনি।

অঙ্গরাজকর্ণ অধিরথ সুতপুত্র তিনি। কুন্তীপুত্র হয়েও নিয়তির খেলাতে নিজের অজ্ঞাতেই কৌরব্রাজ দুর্যোধনের পরম সুহৃদ তিনি। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের অন্যতম মহানায়কও কর্ণ। এসবই তার এক-একটি পরিচয়। এর বাইরেও রয়েছে তার আরও একটি পরিচয়। তিনি দাতা। তার মতাে দাতা খুব কমই দেখা গেছে ভূ-ভারতে। তাঁর কাছে কিছু চেয়ে বিমুখ হয়নি কখনও কেউ। সােনা-দানা, মণিমাণিক্য যে যা চেয়েছে তাই দিয়েছেন তিনি। এমনকী নিজের জীবনের সবচেয়ে বড়াে সুরক্ষা অভেদ্য কবচকুণ্ডলও তিনি হাসিমুখে দান করেছেন অবলীলায়।

বস্তুত মহাবীর কর্ণের চেয়ে দাতা কর্ণই বড়াে হয়ে ওঠেন সকলের কাছে। দানের জন্যই তিনি এক মহােত্তম মানুষ। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নিহত হন কর্ণ। পরিণামে স্থান পান স্বর্গে। মরলােকে যে পরিমাণ সম্পদ তিনি দান করেছিলেন তার সহস্রগুণফিরে আসে তার কাছে। স্বর্ণ সম্পদের বিপুল বৈভবের নিচে তিনি যেন চাপা পড়ে যান। তবুও দুঃখী তিনি একটি অপ্রাপ্তির তীব্র জ্বালা তাকে অস্থির করে তােলে। সব পাচ্ছেন তিনি কিন্তু পাচ্ছেন না খাদ্য। পাচ্ছেন না পানীয়। আর সেই না পাওয়ার যন্ত্রণা বাড়িয়ে তােলে তার কষ্টকে লক্ষ কোটি গুণ।

ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর কর্ণ যান যমরাজের কাছে ক্ষুব্ধ কণ্ঠেই বলেন, এ কেমন বিচার! অফুরন্ত স্বর্ণরত্ন তিনি পাচ্ছেন, কিন্তু সেসব তাে খাদ্য নয়। ক্ষুধার অন্ন নয়। তৃষ্ণার পানীয় নয়। তারই অভাবে যে তিনি বড়াে কাতর। এসব সােনাদানায় কাজ নেই তার। এসব তাে খাওয়া যায় না। সকলের আগে তাে দরকার খাদ্যের। খাদ্য বা অন্নই তাে জীবন। সেইখাদ্য কোথায়?


কর্ণের এই জিজ্ঞাসার মুখে যমরাজ কিছুটা অসহায়। ব্রিত কণ্ঠেই বলেন, এর আমি কী করব?মরলােকে মানুষ যা দান করে, পরলােকে এসে তাই কয়েক সহস্রগুণ ফিরে পায়। বলা যায়, ইহলােকে দানের মূল্যেই মানুষ কেন পরলােকের সুখ। নরলােকে যে যা দান করে, পরলােকে পায়। তাই-ই কর্ণ কুণ্ঠিত ভাবেই বলেন, আমি তাে মর্তে দানে কোনও ত্রুটি রাখিনি। বলা উচিত নয়, তবু বলছি, আমার তাে দানবীর বলে একটা খ্যাতি ছিল। তাহলে কেন বঞ্চিত থাকব খাদ্য-পানীয় থেকে ?
যমরাজ বলেন, সত্য তােমার কথা। সঙ্গত তােমার জিজ্ঞাসা। --তাহলে?

দেখ, আমি আগেই বলেছি, মানুষ যা যা দান করে পরলােকে তাই পায়। তুমি যে অজস্র সম্পদ দান করেছ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাই এখানে এসেও পাচ্ছ তাই। কিন্তু তুমি কোনওদিন কাউকে অন্নদান করনি। দাওনি কোনও তৃষ্ণার্তকে জল। সে কারণে এখানে বঞ্চিত তুমি সেসব থেকে। কিন্তু আমি যে ক্ষুধায় অস্থির। এর একটা বিহিত করুন আপনি। ফিরিয়ে নিন সম্পদ, পরিবর্তে দিন একটু খাদ্য। একটু জল। যমরাজ বলেন, আমি নিরুপায় । ঈশ্বরের বিধান বদলের কোনও ক্ষমতা আমার নেই।

না জেনে অপরাধ করেছি। অন্নজল দান যে এত মহােত্তম দান, এটা জানা ছিল না। সেই অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ক্ষমা করুন। একটা কিছু প্রতিবিধান করুন। করুণা হয় যমরাজের। বলেন, বেশ একটা সুযােগ তােমাকে দিচ্ছি। ফিরে যাও তুমি মর্ত্যলােকে। একটি পক্ষকালের জন্য। যথেচ্ছ দান করাে অন্নজল। নিশ্চিত করাে তােমার এখনকার জীবনের প্রকৃত সুখ। যাও, তবে এক পক্ষকাল, মাত্র পনেরাে দিনের জন্য।

পনেরাে দিনের জন্য কর্ণ ফিরে আসেন মর্তে। পনেরাে দিন ধরে দান করেন অন্ন। তৃষ্ণার্তকে দেন জল। পরিণামে স্বর্গে ফিরে পান অন্ন। পান জল। আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত পনেরাে দিন কর্ণের ছিল দ্বিতীয় দফার মর্তবাস। আর এই পনেরােটি দিনই হিন্দুশাস্ত্রে চিহ্নিত পিতৃপক্ষ হিসেবে। কর্ণ স্বর্গে ফিরে আসেন যে অমাবস্যা তিথিতে সেটিই অভিহিত মহালয় বা Mahalaya নামে।

হিন্দু শাস্ত্রে, পিতৃপক্ষের পনেরাে দিন প্রয়াত পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তিলতর্পণ এবং শ্রাদ্ধ করার বিধি। ওই সময় দরিদ্রদের আহার দান করালে শুধু নিজের নয় পরলােকে পিতৃপুরুষদেরও অন্নজলের অভাব থাকে না।


গরুড়পুরাণে আছে, পুত্রছাড়া মুক্তি নেই। পিতৃপক্ষের পুত্রের দেওয়া অন্নজলেই তৃপ্ত হওয়া যায়।মার্কণ্ডেয় পুরাণেরও নির্দেশ, পিতৃপক্ষে পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিতে হবে। পিতৃপক্ষের তর্পণ আর মহালয়ার শ্রাদ্ধই দেয় মানুষকে সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান এবং সম্পদ। তাই Mahalaya তর্পণে রত হলাে সকলে। শাস্ত্রের বচন, পিতৃপক্ষ বামহালয়াপক্ষেপিতৃপুরুষরা নেমে আসেন মর্তে-দর্শন করেন উত্তরপুরুদের। তর্পণ শ্রাদ্ধে নিজেরা তৃপ্ত হন। আশীর্বাদ করেন। উত্তরপুরক্ষদের। দীপান্বিতা অমাবস্যায় তারা ফিরে যান পিতৃলােকে। তাই মহালয়ার যেমন তর্পণ-শ্রাদ্ধ, দীপান্বিতাতেও তাই। সঙ্গে আকাশ প্রদীপ জ্বালানাে। তাদের পথ দেখানাের জন্য নাকি এও কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারে মানুষকে পথের দিশা দিতেই ধর্মীয় নির্দেশের আড়ালে এক সামাজিক দায় বহানের ব্যবস্থা।

মহালয়ার শুরু দেবীপক্ষের। এই পক্ষেই জগজ্জননী মা দুর্গার অকালবােধন করে রাবণকে নিহত করেন রাম। শারদীয়ার মাতৃবন্দনায় সকলে মাতেন এই দেবীপক্ষে। মহালয়ার শ্রাদ্ধ ও তর্পণ- শুধু বঙ্গের নয় সমগ্র ভারতের অনুষ্ঠান। পিতৃপক্ষের পনেরােদিন না পারলেও অমাবস্যার মহালয়ে তর্পণ ও শ্রাদ্ধে শামিল হয় প্রায় সারা ভারত। এরই মধ্য দিয়ে একাত্ম হন সকলে। তাই Mahalaya একদিক থেকে মিলন, ঐক্য ও জাতীয় এমনকী বিশ্ব-সংহতিরও অনুষ্ঠান। মহালয়ার পিতৃপক্ষের অন্যনাম যােলা শ্রাদ্ধ। ১৬টি শ্রাদ্ধ বা দান করা হয় বলে এই নাম। উত্তর পূর্ব ভারতের নাম পিতৃপক্ষ, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে তারই নাম পিত্ৰুপক্ষ। এছাড়া কানাগত, জিতিয়া, Mahalaya পক্ষ, অপরপক্ষ, সর্বপ্রীতি অমাবস্যা, পিত্র, পেদ্দেশা ও Mahalaya অমাবস্যা নামেও এটি পরিচিত।

লিখেছেনঃ নন্দলাল ভট্টাচার্য

Previous
Next Post »