হিন্দুদের দেবতা ভাঙ্গিয়ে এবার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা।

অযােধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের প্রসঙ্গটি আবার চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সম্প্রতি দেশের শীর্ষ আদালত রামমন্দির সংক্রান্ত মামলার শুনানি আরও পিছিয়ে দেওয়ায় দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ঘােলাজলে মাছ ধরতে চাইছে।

এ ব্যাপারে সব থেকে এগিয়ে আছেন আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। রাজনীতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি এবার বিভাজনের রাজনীতির পথ ধরেছেন। এতদিন তুষ্টিকরণের রাজনীতি করে এসেছেন, এবার সেইসঙ্গে বিভাজনের। আর তা করতে গিয়ে তিনি এবার হিন্দুদের দেবলােকে হানা দিয়েছেন। ঘটনা হলাে গত ২৬ নভেম্বর ঝাড়গ্রামের কাপবাড়িতে প্রশাসনিক সভার মঞ্চ থেকে  তিনি বলেন, “আমরা দেবতা বিক্রি করে খাই না। কিছুদিন আগেই কটাক্ষ করে  তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন--“তােমরা যে রামের পুজো কর, সেই রাম দুর্গাপূজা করেছিলেন।

হিন্দুদের দেবতা ভাঙ্গিয়ে এবার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা।
হিন্দুদের দেবতা ভাঙ্গিয়ে এবার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা।


কিন্তু দুর্গাপুজার সময় তোমাদের নেতাদের বাংলার মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা ব্যানার ফেস্টুনও দেখা গেল না। এই একই বিষয় নিয়েই তৃণমূল সুপ্রিমাের বক্তব্য—“তোমাদের রাম থাকলে আমাদের দুর্গা আছেন। রামচন্দ্রও তাে মা দুর্গার পূজা করেছিলেন, আসলে ওরা (বিজেপি) রাবণের পুজো করে। ওরা দেবতাকে বিক্রি করে খায়।  নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এবার হিন্দুদের দেবতা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মিথ্যা বলেননি। মূল (বাশ্মীকি) রামায়ণে রাবণবধের সময় দুর্গাপূজার কোনও কথা থাকলেও, অন্যান্য পুরাণে, বিশেষত কৃত্তিবাস বিরচিত রামায়ণে আছে। সেখানে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার স্তুতি করেছেন “নমস্তে সর্বাণী ঈশানী ইন্দ্রাণী ঈশ্বরী ঈশ্বরজায়া।.....
সংকল্প রক্ষার জন্য কমললােচন’ শ্রীরাম লক্ষ্মণকে বলেছেন= “এত বলি তৃণ হৈতে লইলেন বাণ।
উপাড়িতে যান চক্ষু করিতে প্রদান ॥” কিন্তু এই দুই রামায়ণে রাবণপূজার। কথা কোথাও নেই। নিজের পক্ষে পুরাণকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে তিনি অধসত্যের আশ্রয় নিয়েছেন। অর্ধসত্য মিথ্যার থেকেও ভয়ংকর।

বস্তুত ভারতীয় জাতিসত্তায় রাবণপূজার স্থান নেই। থাকা সম্ভবও নয়। যেসব মূল্যবােধের উপর ভারতবর্ষ দাঁড়িয়ে আছে, এক কথায় যাকে ‘ধর্ম বলে তার অন্যতম অঙ্গ-- মাতৃবৎ পরলারেষু। রাবণ এই মূল্যবােধের উপরই প্রচণ্ড আঘাত করেছিলেন। রাম অধার্মিক  রাবণকে বধ করে ধর্মকে সংরক্ষণ করেছিলেন।

তাই রাম ভারতীয় জাতিসত্তার প্রতীক। অযােধ্যার  রামজন্মভূমিতে রামমন্দির তাই একটা মন্দির নির্মাণ মাত্র নয়, তা জাতীয় স্মারক। হাজার হাজার বছর ধরে আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষে যে জীবনধারা বহমান, তারই এক প্রতীকী প্রকাশ। বিদেশি মুঘল বাদশা বাবরের আক্রমণের চিহ্ন হিসাবে নির্মিত বাবরি কাঠামাে তাই জাতীয় কলঙ্ক। কোনও স্বাভিমানী জাতিই নিজের কলঙ্ক-চিহ্ন বহন করে না। স্বাধীন হওয়া মাত্রই পােল্যান্ড তাই রাশিয়ার কমিউনিস্টদের তৈরি গির্জা ভেঙে দিয়েছিল। দেশে দেশে একম অনেক উদাহরণ মিলবে। তাই অসহিষ্ণুতার নামাবলী গায়ে চাপিয়ে এত বিরােধিতা ভণ্ডামি, মিথ্যাচার। মনে রাখতে হবে, ধৈর্যেরও একটা সীমা থাকে।

গত চারশাে বছর ধরে জাতীয় অস্মিতা রক্ষার জন্য এদেশের হাজার হাজার মানুষ একের পর এক সংগ্রাম করে চলেছে, আত্মবলি দিয়েছে। এরপরও গত পাঁচ দশক ধরে এদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে এসেছে। সাম্প্রতিক শীর্ষ আদালতের একটা রায়ে সেই আস্থার উপর চিড় দেখা দিয়েছে। কোনও রাজনীতিক মহলের। স্বার্থে দেশের বিচার ব্যবস্থা রামমন্দির প্রসঙ্গটি জিইয়ে রাখতে চহিছেন-- এরকম একটা আশঙ্কা ক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কংগ্রেসের কপিল সিব্বল শীর্ষ আদালতকে লােকসভা নির্বাচনের পর রায়  দিতে অনুরােধ জানিয়েছেন। তাহলে কী এমন ঘটল যে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রামমন্দির নির্মাণকারীদের রাবণের পূজারি হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন ? তিনি কি এবার হিন্দুদের মধ্যে বিভেদের বীজ বুনতে চাইছেন? হিন্দু বাঙ্গালিদের মধ্যে লড়াই লাগাতে চাইছেন। দুর্গাপূজা শুধুই আমাদের (হিন্দু বাঙালির)? আর বলছেন, আমাদের দুর্গা আছেন। বাকি ভারতের দুর্গাপূজা নেই? দেবীপক্ষের নয়দিন নবরাত্রি ব্রত হিসাবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে পালিত হয়। এই নয়টি দিন বেশিরভাগ মানুষই উপবাস পালন করে আপন আপন চিত্ত শুদ্ধি'র জন্য ব্রতী থাকেন। উপবাস ভঙ্গেও কোনও দেখনদারি নেই। অন্যদিকে যত দিন যাচ্ছে, এই রাজ্যে দুর্গাপূজা শারদীয়া উৎসবের রূপ নিচ্ছে। পূজার মাঙ্গলিক দিকটি কেমন যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

দুর্গাপূজার বদলে থিমপূজা হচ্ছে, খুটি পূজা হচ্ছে। বিশেষ করে শহর আর শহরতলীর পূজার ক্ষেত্রে। বিসর্জনের রীতিনীতিকে রাজ্যের প্রশাসনের নির্দেশে বদলে নিতে হচ্ছে। দেবীপক্ষের আগেই মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীদুর্গার আবাহন হয়ে যাচ্ছে। এখন পূজাকে নিয়ে কমপিটিশন কর্নিভালের উন্মাদনা। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষে বহু উপসিক, বহু সম্প্রদায় পাশাপাশি বসবাস করছে। অক্ষয় দত্তের ভারতবর্যের উপাসক সম্প্রদায় গ্রন্থে তার বিস্তৃত বিবরণও আছে। কেউ কখনও “তােমাদের রাম থাকলে আমাদের দুর্গা আছে বলে বিভাজনের সৃষ্টি করেনি।

উপাসনা পদ্ধতির বিভিন্নতা থাকলেও ভারবর্ষে হিন্দুসমাজ জাতীয় অস্মিতা রক্ষায় বরাবরই সচেষ্ট থেকেছে, এমনকী প্রয়ােজনে কুর্মবৃত্তি অবলম্বন করেও । এই যে বিজিগীষু মানসিকতা বিপরীত পরিস্থিতিতেও নিজেদের লক্ষ্যে অটুট থাকা, জাতীয় অস্মিতাকে কোনও ভাবেই ধ্বংস না হতে দেওয়া-- এটাই ভারতের জাতীয় বৈশিষ্ট। গ্রিস, মিশর, রােমে যা ঘটেছে হিন্দুসমাজ তা করতে দেয়নি। মুঘল- পাঠানদের বারােশাে বছরের অত্যাচার সত্ত্বেও হিন্দুসমাজ ধবংস হয়নি। সােমনাথ মন্দির বিদেশি আক্রমণকারীরা বারবার লুণ্ঠন করেছে, কিন্তু কী আশ্চর্য, গুজরাটের সমুদ্রতটে সােমনাথ মন্দিরের শীর্ষে শিবধ্বজ পতপত করে উড়ছে। প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুর আপত্তি সত্ত্বেও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের উদ্যোগে দেশের মানুষের আবেগ বাস্তবায়িত হয়েছে।

সেই দৃশ্যটা এখনও চোখের সামনে ভাসছে। সােমনাথ বাস টার্মিনালে আমেদাবাদ যাওয়ার বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। একটু পরেই সেই বাস এসে দাঁড়াল, দেখলাম ড্রাইভার সাহেব মন্দিরের চুড়ার দিকে তাকিয়ে দুহাত জোড় করে প্রণাম করছেন। এই যে আবেগ, মঙ্গলময়র প্রতি আস্থা, এটাই ভারতীয় সত্তা, অস্মিতা। শ্রীরামচন্দ্র এই অস্মিতারই প্রতীক। রামমন্দির নির্মাণ আন্দোলন এই অস্মিতাকে রক্ষা করারই সংগ্রাম। উপাসনা পদ্ধতির ভিত্তিতে হিন্দুসমাজকে বিভক্র করার চেষ্টা তাই রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামান্তর। দুর্গাকে ভাঙিয়ে ভােটব্যাঙ্ক স্ফীত করার মতাে অপচেষ্টা হিন্দু সমাজ ঘৃণার সঙ্গেই বারবার প্রত্যাখান করেছে, এবারও করবে। এখানে রাম শিবকে পূজা করেন, শিব রামকে—সৃষ্টি হয় রামেশ্বর।।

রাম দেবী দুর্গার স্তুতি করেন, দেবী রামের রাবণবধের সংকল্পকে রক্ষা করেন। রাবণ পূজার প্রশ্নই তাে উঠে না। তবে? রাজনীতির জন্য, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জাতিসত্তাকে, রাষ্ট্রীয় অস্মিতাকে খুন করতেও দ্বিধা করব না? আবার ৪৬-৪৭-এর পুনরাবৃত্তি চাইছি ?

Previous
Next Post »